বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষোভ, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ-যশোরে ভিন্ন চিত্র

দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ক্ষুব্ধ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন, এমনকি বিদ্যুৎ অফিসে হামলার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েকটি বিদ্যুৎ অফিস থেকে নিরাপত্তার জন্য থানা-পুলিশকে জানানো হয়েছে। তবে এর মধ্যেই দেশের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে।
বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও যশোরের কয়েকটি এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলাকার কোথাও গত কয়েক দিন ধরে লোডশেডিং নেই, আবার কোথাও তুলনামূলক কমেছে। তবে একই জেলার অন্য উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে এখনো দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের অভিযোগ রয়েছে।
বগুড়ায় স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ
বগুড়ায় জুন-জুলাই থেকে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। কমতে থাকে লোডশেডিং। বৃহস্পতিবার থেকে জেলার বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এতে স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরমের সময় একসময় দিনে গড়ে আট ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যেত না। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসেও দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। তবে জুনের পর বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বগুড়ার ১৩টি উপজেলায় নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) এবং দুটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৃহস্পতিবার থেকে নেসকোর আওতাধীন এলাকায় চাহিদার প্রায় পুরো বিদ্যুৎই সরবরাহ করা হচ্ছে।
নেসকো বগুড়া অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইমদাদ সেলিম বলেন, কয়েক দিন ধরে নেসকোর আওতাধীন এলাকায় কোনো লোডশেডিং নেই। ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পুরো ১১০ মেগাওয়াটই সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকার বাসিন্দা গোলাম রব্বানী জানান, কয়েক দিন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট থাকলেও বৃহস্পতিবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজনী গ্রামের ফজলুল হক বলেন, কিছুদিন আগেও লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এখন ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকায় রাতে স্বস্তিতে ঘুমানো যাচ্ছে।
বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক শামিমুর রহমান জানান, তাঁদের আওতাধীন সাতটি উপজেলায় বৃহস্পতিবার থেকে কোনো লোডশেডিং করা হয়নি। ওই এলাকায় চাহিদা ছিল ৮৫ মেগাওয়াট এবং সরবরাহও ছিল ৮৫ মেগাওয়াট।
তবে বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এলাকায় বৃহস্পতিবার দিনে কিছুটা ঘাটতি ছিল। সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোজাহিদুল ইসলাম জানান, তাঁদের গড় চাহিদা ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার দিনে ১১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৯৯ মেগাওয়াট। এতে অল্প সময় লোডশেডিং হলেও রাত ১২টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। বগুড়া শহরের হোটেলপট্টির কাফেলা হোটেলের স্বত্বাধিকারী রাজু আহমেদ জানান, এক ঘণ্টা লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালাতে প্রায় ২০০ টাকার পেট্রল খরচ হয়। বৃহস্পতিবার থেকে তাঁকে একবারও জেনারেটর চালাতে হয়নি।
সিরাজগঞ্জে মন্ত্রীর আসনে তুলনামূলক স্বস্তি
সিরাজগঞ্জের সদর ও কামারখন্দ উপজেলায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের ভাষ্য, ঝড়-বৃষ্টি বা কারিগরি ত্রুটি ছাড়া এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে না।
কামারখন্দ উপজেলার রায়দৌলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল আলীম জানান, তাঁদের এলাকায় লোডশেডিং নেই বললেই চলে।
একই এলাকার আল আমিন বলেন, তিনি ঢাকায় থাকেন। ছুটিতে বাড়িতে এসে দেখেছেন, ঢাকার তুলনায় কামারখন্দে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট অনেক কম। শুক্রবার দুপুরে মাত্র ১০ মিনিট বিদ্যুৎ ছিল না বলে জানান তিনি।
ভদ্রঘাট এলাকার বাসিন্দা হাসান বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলেও সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে। তবে ঝড়-বৃষ্টির সময় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হতে পারে।
জামতৈল বাজারের ব্যবসায়ী কিবরিয়া বলেন, তাঁদের এলাকায় মাঝে মাঝে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকে না। তবে সেটি মূলত লাইনের সমস্যাজনিত কারণে।
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার বাসিন্দা রিপনও জানান, আশপাশের উপজেলায় বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের খবর পাওয়া গেলেও সদর এলাকায় লোডশেডিং তুলনামূলক কম।
তবে জেলার উল্লাপাড়া, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী ও রায়গঞ্জের গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এতে গৃহস্থালির পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও তাঁতশিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
চৌহালীর খাষকাউলিয়া এলাকার এক বাসিন্দা জানান, শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পাঁচবার বিদ্যুৎ গেছে। প্রতিবার ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর বিদ্যুৎ এলেও আগের ২৪ ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২ বার বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হয়েছে। কখনো তিন থেকে চার ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ ফিরে এসে আবার ২০ মিনিটের মধ্যেই চলে গেছে বলেও জানান তিনি।
রায়গঞ্জ উপজেলার পশ্চিম আটঘরিয়া গ্রামের উপেন্দ্র নাথ মাহাতো বলেন, কয়েক দিন ধরে দিনে-রাতে সাত-আটবার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কখনো কখনো আট-নয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তবে শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুবার আধা ঘণ্টা করে লোডশেডিং হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুন নুর জানান, তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে এবং সদরে কোনো লোডশেডিং নেই। তবে চাহিদা ও সরবরাহের পরিস্থিতি নিয়মিত পরিবর্তিত হয়।
যশোর সদরে নেই লোডশেডিং, ভোগান্তি গ্রামাঞ্চলে
যশোরের চিত্রও এলাকাভেদে ভিন্ন। জেলার সদর এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক ভালো থাকলেও গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
মনিরামপুর উপজেলার কাশিমনগরের ব্রয়লার মুরগি বিক্রেতা নুরনবী শেখ জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই ঘন ঘন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হওয়ায় মুরগি জবাই ও পরিষ্কার করতে পারেননি। ফলে ক্রেতাদের অনেকে প্রয়োজনীয় মাংস না পেয়ে ফিরে গেছেন।
অন্যদিকে যশোর সদর এলাকায় গত এক সপ্তাহে লোডশেডিং তুলনামূলক কম ছিল। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে বড় ধরনের বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সদরের ইউনিয়নগুলোতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এবং শহরে ওজোপাডিকোর দুটি বিতরণ বিভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
ওজোপাডিকোর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১, যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন জানান, শুক্রবার যশোর শহরে লোডশেডিং ছিল না। ওই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৬৫ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৬১ মেগাওয়াট।
তবে শহরের বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি বেশ কঠিন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় দিনে গড়ে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান বলেন, ১৫০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তাঁরা মাত্র ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। সরবরাহ ঘাটতির কারণেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্রে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। কোথাও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও অন্য এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।