নীলাভ পানির রহস্যময় বগা লেক

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২৪৬ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের কোলে রূপকথার মতো জেগে আছে এক নীল জলের আধার—বগা লেক। বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলায় অবস্থিত এই প্রাকৃতিক হ্রদটি পর্যটকদের কাছে কেবল এক বিস্ময় নয়, বরং রোমাঞ্চ আর রহস্যের এক মিশেল। পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই মিঠা পানির লেকটি যেন আকাশের নীল এক মুঠো জল নিয়ে পাহাড়ের বুকে থমকে দাঁড়িয়েছে।
রহস্যময় উৎপত্তি ও উপকথা
বগা লেকের সৃষ্টি নিয়ে স্থানীয় পাহাড়িপাড়ায় প্রচলিত রয়েছে রোমাঞ্চকর সব উপকথা। ‘বম’ ভাষায় ‘বগা’ শব্দের অর্থ ড্রাগন। স্থানীয় বম ও খুমি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, বহুকাল আগে এই পাহাড়ে এক ড্রাগন বাস করত যা ছোট বাচ্চাদের খেয়ে ফেলত। অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসী ড্রাগনটিকে হত্যা করলে ওর মুখ থেকে নির্গত আগুন আর ভূমিকম্পে পাহাড় ধসে এই গভীর হ্রদের সৃষ্টি হয়। ভূতাত্ত্বিকদের মতে অবশ্য এটি প্রায় ২,০০০ বছর আগে মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বা উল্কাপাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।
প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য
প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই লেকের জলধারা সবসময় স্বচ্ছ নীল থাকে। তবে মজার ব্যাপার হলো, প্রতি বছর এপ্রিল-মে মাসের দিকে কোনো দৃশ্যমান উৎস ছাড়াই লেকের পানি ঘোলাটে হয়ে যায়, যা আজও এক অমীমাংসিত রহস্য। হ্রদটি তিন দিক থেকে সুউচ্চ পাহাড় আর বাঁশঝাড়ে ঘেরা, যা এর নির্জনতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ভ্রমণার্থীদের স্বর্গরাজ্য
প্রকৃতিপ্রেমী এবং ট্রেকারদের কাছে বগা লেক একটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। এখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চতম শৃঙ্গ কেওক্রাডং জয়ের অভিযান। লেকের তীরে অবস্থিত বম পাড়ার কাঠের কটেজগুলোতে রাত্রিযাপন পর্যটকদের পাহাড়ি জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
পরিবেশ ও পর্যটনের বর্তমান অবস্থা
স্থানীয় বাসিন্দারা এই লেকের পানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। তবে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে লেকের পরিবেশ হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাহাড়ের এই অনন্য সম্পদ রক্ষায় পর্যটকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশবাদীরা।
দৈএনকে/জে, আ