বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • আজ বিশ্ব বাঘ দিবস বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডির নতুন প্রধান ব্যারিস্টার মোশাররফ হোছাইন উজবেকিস্তানকে উড়িয়ে কাভা ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশ সরকারি চাকরিতে নারীদের কোটা পুনর্বহালের দাবি মহিলা পরিষদের হামের উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, মোট প্রাণহানি বেড়ে ৮২৮ জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে শপিং মল ধস, আহত অর্ধশত; প্রত্যাহার সুনামি সতর্কতা পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয়ে অর্থ দাবি, প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী বিএসইসিতে চার বছরের জন্য নতুন কমিশনার হোসেন সাদাত সৌরবিদ্যুতের প্রসারের আড়ালে বাড়ছে ই-বর্জ্যের ঝুঁকি, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা
  • ইতিহাসের নীরব সাক্ষী আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি

    ইতিহাসের নীরব সাক্ষী আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    ঈশ্বরগঞ্জের ঐতিহ্য, রবীন্দ্রনাথের পদচিহ্ন আর হারিয়ে যেতে বসা এক জনপদের গল্প।

    ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ইমারতগুলো যেন নীরবে বলে চলে দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ইতিহাসের কথা। লতাগুল্মে ঢাকা দেয়াল, ভেঙে পড়া খিলান, জীর্ণ দরবার হল ও কাছারি ঘর—সব মিলিয়ে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি আজ একদিকে যেমন ঐতিহ্যের স্মারক, অন্যদিকে তেমনি অবহেলার প্রতীক। এই জমিদার বাড়িকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আঠারবাড়ী গ্রাম; যার নামকরণও হয়েছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই রাজবাড়ির সূত্র ধরে।

    প্রায় আড়াই শত বছর আগে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন দ্বীপ রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন যশোর জেলার একটি পরগনার জমিদার। জমিদারির বিস্তার ও প্রশাসনিক সুবিধার কথা বিবেচনা করে তিনি ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন শিবগঞ্জ বা গোবিন্দ বাজার এলাকায় জমিদারি ক্রয় করেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে এই জনপদ রায় বাজার নামে পরিচিত হলেও সময়ের ব্যবধানে সেটিই পরিচিতি পায় আঠারবাড়ী নামে।

    স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, জমিদারি পরিচালনার কাজে সহায়তার জন্য দ্বীপ রায় চৌধুরী যশোর থেকে আঠারটি হিন্দু পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তাঁদের জন্য পৃথকভাবে বসতবাড়ি নির্মাণ করে দেন এবং জমিদারির কাজে যুক্ত করেন। এই ‘আঠারটি বাড়ি’ থেকেই ধীরে ধীরে পুরো এলাকাটি আঠারবাড়ী নামে পরিচিত হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামে রূপ নেয়।

    দ্বীপ রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তাঁর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি প্রমোদ রায় নামে এক ব্রাহ্মণ সন্তানকে দত্তক হিসেবে লালন-পালন করেন। পরবর্তীতে প্রমোদ রায় চৌধুরীই আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির উত্তরাধিকারী হন। তাঁর শাসনামলেই এই জমিদার বাড়ি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করে।

    রবীন্দ্রনাথের আগমন ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
    আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমন। ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে কবিগুরু আঠারবাড়ী রাজবাড়ি পরিদর্শনে আসেন। জানা যায়, প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী এবং তাঁর শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

    এই সফর উপলক্ষে কবিগুরুর সম্মানে জমিদার বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি বাউল, জারি-সারি গানের আসর বসে। সেই সময় আঠারবাড়ী ও আশপাশের অঞ্চলে কবিগুরুর আগমন ছিল এক বিরল ঘটনা, যা সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।

    স্থানীয় ইতিহাস গবেষক স্বপন ধর মাধ্যমে জানা যায়, “আঠারবাড়ী জমিদার বাড়িতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনের বিষয়ে বিস্তর নথিপত্র রয়েছে। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই ভ্রমণের কথা ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল।”

    তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কবিগুরুর আগমনের এই ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণে আঠারবাড়ীতে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিনের অবহেলায় জমিদার বাড়ির অধিকাংশ ভবন এখন ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর মতে, এখনো সময় আছে—কবিগুরুর স্মৃতি রক্ষায় অন্তত কাছারি ঘরটি সংস্কার করে একটি স্মৃতিধন্য স্থান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

    আঠারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ কর্মরত সংশ্লিষ্টগণ জানান এবং বলেন, “জমিদার বাড়ির কাছারি ঘরটি, যেটি স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারোদ্‌ঘাটন করেছিলেন, সেটিকে কবিগুরুর স্মৃতিভবন হিসেবে সংরক্ষণ করা জরুরি।”

    তারা আরও বলেন, একটি বেসরকারি কলেজের পক্ষে এই ধরনের সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করা ব্যয়সাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ বা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলে ঐতিহ্যটি রক্ষা করা সম্ভব।

    ১৯৬৮ সালে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির বিস্তৃত জমির একটি অংশে প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ। কলেজের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বিশাল খেলার মাঠ এবং জমিদার বাড়ির অন্দরমহল। আরও ভেতরে রয়েছে দরবার হল, কাছারি বাড়ি এবং ঐতিহ্যবাহী রানীপুকুর—যা একসময় জমিদারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

    শুধু ইতিহাস নয়, আধুনিক সাংস্কৃতিক মাধ্যমেও আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির উপস্থিতি রয়েছে। কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’ চলচ্চিত্রের (২০০৩) বেশ কিছু দৃশ্যের চিত্রায়ন হয়েছে এই জমিদার বাড়িতে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছেও স্থানটি নতুন করে পরিচিতি পায়। অবহেলায় হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা। 

    বর্তমানে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির অনেক স্থাপনাই চরম জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। লতাগুল্মে ঢেকে গেছে ছাদ ও দেয়াল, কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে মূল কাঠামো। পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের অভাবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

    ইতিহাসপ্রেমী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দ্রুত সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া গেলে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিতে পারে।

    আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়—এটি ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সম্মিলিত স্মারক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচিহ্নে সমৃদ্ধ এই স্থান সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ঈশ্বরগঞ্জের এই গৌরবময় অতীত একদিন কেবল স্মৃতির পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন