জেএসসি-জুনিয়র বৃত্তি বাতিল, শিক্ষায় আসছে বড় পরিবর্তন

অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত মাধ্যমিক শিক্ষার উন্নয়নবিষয়ক পরামর্শক কমিটি। একই সঙ্গে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাতিল এবং নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা) পদ্ধতি তুলে দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটি জানায়, শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার চাপ কমাতে এবং পাঠ্যক্রমভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতি জোরদার করতে এসব সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাদের মতে, অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ায় এবং কোচিংনির্ভর শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখে। তাই বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষাও বাদ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে, কারণ এটি মূল পাঠ্যক্রমের বাইরে আলাদা প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করে। বরং মেধা ও প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি চালুর পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।
এ ছাড়া নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন পদ্ধতি বাতিলের প্রস্তাব দিয়ে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের একটি সমন্বিত ও বিস্তৃত জ্ঞানভিত্তি গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। অল্প বয়সে বিভাগ নির্ধারণ করলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে।
কমিটির সুপারিশগুলো চূড়ান্ত হলে মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে পারে।
এ ছাড়া কমিটি মাধ্যমিকে সব বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিয়ে মূল দক্ষতাসংশ্লিষ্ট নির্ধারিত কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়ার এবং বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে সেপ্টেম্বর থেকে জুন বা কাছাকাছি সময়ে শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণের সুপারিশ করেছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি গতকাল মঙ্গলবার সুপারিশসহ খসড়া প্রতিবেদন সচিবালয়ে শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে জমা দেন। প্রতিবেদনে কমিটি আশু, মধ্য মেয়াদে এবং দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য একগুচ্ছ সুপারিশ করেছে। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রমের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে গত বছরের অক্টোবরে শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও মাধ্যমিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়।
প্রতিবেদনের বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘শিক্ষা খাত কেবল একটি সেকেন্ডারি সেক্টর নয়, বরং জাতি গঠনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বর্তমান উদ্যোগটি সম্পূর্ণভাবে দেশীয় চাহিদা, মেধা ও শ্রমের সমন্বয়ে সম্পন্ন হয়েছে। আশা করি, এই কমিটির সুপারিশগুলো পরবর্তী সরকার গুরুত্বসহ বিবেচনা করবে।’
জানা যায়, এই কমিটি দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪৪টি কর্মশালা ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এ ছাড়া অষ্টম ও নবম শ্রেণি সমাপ্ত করা ৪৩৭ জন শিক্ষার্থীর বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পরীক্ষাও নিয়েছে। প্রতিবেদনে সাধারণ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ করেছে কমিটি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালে প্রণীত ‘নতুন শিক্ষাক্রমে’ নবম শ্রেণিতে বিভাগ (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা ইত্যাদি শাখা) বিভাজন তুলে দেওয়া হয়েছিল। বাতিল করা হয়েছিল পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার সেই শিক্ষাক্রম বাতিল করে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যায়। এতে নবম শ্রেণিতে বিভাগ বিভাজন, বৃত্তি পরীক্ষাসহ প্রতিটি শ্রেণিতেই পুরোনো পদ্ধতি ফিরে আসে।