জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত কমিশনের অপ্রকাশিত প্রতিবেদনে কী আছে

জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত কমিশনের ৪৫ বছর ধরে অপ্রকাশিত থাকা প্রতিবেদন সামনে এসেছে বলে দাবি করেছে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর করা মূল প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি তাদের হাতে এসেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। ঘটনার পর ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করেন। কমিশনের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল এবং জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না, জড়িত ব্যক্তি, পরিকল্পনা ও সহযোগীদের চিহ্নিত করা। তবে পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিশনের কার্যপরিধি থেকে ষড়যন্ত্র অনুসন্ধানের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। এরপর কমিশনের তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হয় রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব পালন এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সার্কিট হাউসে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সদস্য ও অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা কার্যত কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই অভিযান চালাতে সক্ষম হয়। প্রতিবেদনে লাতিন উক্তি "Veni, Vidi, Vici" (এলাম, দেখলাম, জয় করলাম) ব্যবহার করে বলা হয়েছে, হামলাকারীদের জন্য পুরো অভিযানটি যেন এতটাই সহজ ছিল।
কমিশনের মতে, প্রধান ফটক খোলা ছিল, সিঁড়িতে কার্যকর নিরাপত্তা ছিল না এবং দায়িত্বে থাকা সদস্যদের অবস্থানেও বড় ধরনের গাফিলতি ছিল। হামলাকারীদের কেউ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল এওয়াইএম মাহফুজুর রহমান এবং এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পেছনে ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের একজন বা একাধিক ব্যক্তির ভূমিকা থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
কমিশন আরও উল্লেখ করেছে, হামলার সময় মাহফুজুর রহমানের কক্ষে পাওয়া গুলির চিহ্নের বিষয়ে তার বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদন্তকারীরা এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি যে কিছু আলামত পরে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ক্ষেত্রেও কমিশন প্রশ্ন তোলে, রাষ্ট্রপতির কক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত দরজা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটি ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেননি।
মরদেহ সুরক্ষায় ব্যর্থতা
হত্যার পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ দীর্ঘ সময় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল এবং পরে বিদ্রোহী সেনারা সেটি সরিয়ে নিয়ে যায়। কমিশন বলেছে, মরদেহ সুরক্ষায় কেন্দ্র কিংবা স্থানীয় প্রশাসন—কোনো পক্ষ থেকেই কার্যকর নির্দেশনা বা উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পরে রাঙ্গুনিয়ার একটি গণকবর থেকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতার অভিযোগ
প্রতিবেদনের উপসংহারে কমিশন বলেছে, মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের বিদ্রোহী পরিকল্পনা সম্পর্কে কার্যকর আগাম তথ্য দিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও ডিজিএফআই ও এনএসআই কমিশনকে জানিয়েছিল, তারা মঞ্জুরের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে একাধিকবার সতর্ক করেছিল।
কমিশনের মতে, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীগুলোর সমন্বয়ের অভাবই রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিল।
মঞ্জুরের দুই দিনের বিদ্রোহ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি হত্যার পর মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সরকারের ঘোষণা দেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে নিজের নির্দেশ মেনে চলতে বলেন। তবে সেনাসদরের সঙ্গে আলোচনার পর বিদ্রোহ ভেঙে পড়ে এবং ১ জুন তিনি আত্মসমর্পণ করেন। পরে সেনা হেফাজতে নেওয়ার পর তাকে হত্যা করা হয়। তবে তার হত্যাকাণ্ড তদন্তের দায়িত্ব এই কমিশনের আওতায় ছিল না।
কমিশনের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ
কমিশনের চূড়ান্ত মতামতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থার বহুমাত্রিক ব্যর্থতার ফল। পর্যাপ্ত জনবল, অস্ত্র এবং কৌশলগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।