বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • পুলিশি বাধায় আটকে এনসিপি, ‘মামলা না করে ফিরব না’ বললেন নাহিদ শাপলা চত্বরের মামলায় লতিফ সিদ্দিকী গ্রেপ্তার এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদন একপেশে ও পক্ষপাতদুষ্ট: চিফ প্রসিকিউটর শিল্পে গ্যাস সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ভারত: হাইকমিশনার ক্যান্টিনের খাবার, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার মান যাচাই করলেন পর্যটনমন্ত্রী পেপ্যাল সেবা চালুর পথ খুলল বাংলাদেশ ব্যাংক ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে ঢাকার আহ্বান লিটনের নেতৃত্ব, বিপিএল ও কোচিং স্টাফ—বিসিবি সভায় যেসব ইস্যু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে দীনেশ ত্রিবেদী
  • ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: বিচারহীনতার ভার বয়ে চলেছেন বাবা

    ফেলানী হত্যার ১৫ বছর: বিচারহীনতার ভার বয়ে চলেছেন বাবা
    ছবি- সংগৃহীত
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    ‘১৫ বছর পেরিয়ে গেল, কিন্তু আমার মেয়ে ফেলানী হত্যার বিচার এখনো পেলাম না।’ — কথাগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে আজও কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে ফেলানীর মায়ের। দীর্ঘ দেড় দশকেও ন্যায়বিচার না পাওয়ার বেদনা তার চোখের পানিতে স্পষ্ট।

    মা তার আকুতি প্রকাশ করে বলেন, “এখনো দেশের বিভিন্ন সীমান্তে পাখির মতো মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। আমি যেমন আমার মেয়েকে হারিয়ে সারাজীবন চোখের পানি ফেলছি, তেমনি আর কোনো বাবা–মায়ের বুক যেন খালি না হয়, আর কোনো মা–বাবার কলিজার টুকরা যেন ঝরে না যায়— সেটাই আমার চাওয়া।”

    ২০১১ সালে কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া পেরোনোর সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় কিশোরী ফেলানী। তার নিথর দেহ দীর্ঘ সময় সীমান্তের তারে ঝুলে থাকার ছবি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের প্রতীকী দলিল হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই ঘটনার ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ এখনও কাটেনি তার পরিবারের।

    শুধু ফেলানী নয়, প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। পরিবারগুলো হারাচ্ছে সন্তান, স্বামী, ভাই কিংবা বাবা। সীমান্ত হত্যার এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা মানবাধিকার সংগঠন, সাধারণ মানুষ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বহুবার আলোচনায় উঠলেও নিহত পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের পথ এখনও কঠিন ও দীর্ঘ।

    ফেলানীর মা এখন আর শুধু নিজের মেয়ের বিচার চান না— তিনি চান সীমান্তে আর একটি প্রাণও যেন না ঝরে। তার মতে, ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়, এটি ভবিষ্যতের হত্যাকাণ্ড বন্ধ করার নিশ্চয়তাও।

    তার শেষ কথায় শুধু বেদনা নয়, আছে আশারও বার্তা— “আমার মেয়েকে ফেরত পাবো না, কিন্তু আর কোনো মেয়ের জীবন যেন ঝরে না যায়, আর কোনো বাবা–মা যেন আমার মতো কান্নার সাগরে ভাসতে না হয়— সেটাই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।”

    কথাগু‌লো ব‌লেছি‌লেন, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বাবার সঙ্গে কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়ার সময় বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়া কিশোরী ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম।

    ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নিহত হয় কিশোরী ফেলানী খাতুন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার দৃশ্য দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

    হত্যার ১৪ বছর পার হলেও এখনো বিচার পায়নি তার পরিবার। ভারতের উচ্চ আদালতে মামলা ঝুলে থাকায় দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন ফেলানীর মা-বাবা।

    ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম আরও বলেন, ফেলানী হত্যার বিচার এখনো ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে। তার ভাষ্য, ‘ফেলানী হত্যার সঠিক বিচার হলে আর কোনো বিএসএফ সীমান্তে গুলি করার সাহস পাবে না। এখন আমার বয়স হয়ে গেছে। দেশে নির্বাচনে যে সরকারই আসুক, আমি ফেলানী হত্যার বিচারটা আগে দেখতে চাই। আমি বাঁইচা থাকতে ফেলানী হত্যার বিচার দেখতে চাই। মেয়ে হত্যার বিচার না দেখে মরেও শান্তি পাবো না।’

    নুর ইসলাম জানান, অভাবের সংসারে পরিবারসহ ভারতে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন তিনি। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দালালের মাধ্যমে দেশে ফেরার সময় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। তিনি বলেন, ‘আমার চোখের সামনে বিএসএফ সদস্য অমীয় ঘোষ আমার মেয়েকে হত্যা করে। আমি মেয়ের লাশ কাঁটাতারের ওপর ফেলে রেখেই পালিয়ে আসি। এরপর পাঁচ ঘণ্টা আমার মেয়ের লাশ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল।’

    ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘ফেলানী আমার বড় মেয়ে। আমার মেয়েকে যখন হত্যা করা হয়, তখন আমি ভারতে ছিলাম। বোনের ছেলের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য আমার স্বামী ফেলানীকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসছিলেন। আসার পথে সীমান্তে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় বিএসএফ গুলি করে আমার মেয়েকে মেরে ফেলে। ওরা আমার মেয়েকে হত্যা করে আমার বুকটা খালি করে দিয়েছে।’

    জাহানারা বেগম আরও বলেন, ‘ফেলানীকে হত্যার ১৪ বছর পেরিয়ে ১৫ বছর হলো, কিন্তু আজও আমি কোনো বিচার পাইনি। আমি ১৪ বছর ধরে আশা করে আছি, কোনো একদিন মেয়ে হত্যার সঠিক বিচার পাবো।’ তিনি বর্তমান সরকারের কাছে ফেলানী হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

    গত বছ‌রের ২৩ ফেব্রুয়ারি কিশোরী ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন (২১) বিজিবির সদস‌্য হি‌সে‌বে যোগদান ক‌রেন।

    হত্যাকাণ্ডের পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। পরে বিজিবির আপত্তিতে ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনরায় বিচার শুরু হলেও সেখানেও খালাস পান তিনি।

    এরপর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’ এর মাধ্যমে ভারতের উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম। কয়েক দফা শুনানির তারিখ নির্ধারিত হলেও মামলাটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

    নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনিটারী গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ফেলানী হত্যার বিচারের পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি দীর্ঘদিনের। তাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত না হওয়ায় সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না।

    নুর ইসলাম ও জাহানারা বেগম দম্পতির আট সন্তানের মধ্যে সবার বড় ছিলেন ফেলানী খাতুন। ১৯৯৬ সালে জন্ম নেওয়া ফেলানী পরিবারের সঙ্গে ভারতে বসবাস করছিল। বিয়ের উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পথেই সীমান্তে প্রাণ হারায় সে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন