খালেদা জিয়ার ৪১ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এক প্রভাবশালী ও আলোচিত নাম।
গৃহবধূ হিসেবে জীবন শুরু করলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে খালেদা জিয়ার পথচলা শুরু হয় গভীর ব্যক্তিগত শোককে সঙ্গী করে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর নেতৃত্ব সংকটে পড়ে বিএনপি। সেই সংকটময় সময়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি দলটিতে যোগ দেন। পরবর্তী এক বছরের মধ্যেই তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা ৪১ বছর তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন নেতৃত্বের কারণে খালেদা জিয়া দ্রুতই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তোলে। বারবার গৃহবন্দি ও অন্তরীণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আন্দোলন থেকে সরে যাননি। এ সময় তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। তার নেতৃত্বেই সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি আরও দুই দফা—১৯৯৬ ও ২০০১ সালে—প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের মেয়াদ ছিল এক মাসের।
চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়াকে পোহাতে হয়েছে নানা সংকট। কারাবরণ, মামলা, পারিবারিক শোক এবং রাজনৈতিক বয়কট তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হয়ে তিনি ৩৭২ দিন কারাবন্দি ছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার মায়ের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় আবারও কারাবরণ করেন তিনি। পরে করোনা মহামারির সময় শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান।
নির্বাচনী রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি যে কয়টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, কখনোই নিজের আসনে পরাজিত হননি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে একাধিক আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবগুলোতেই জয়ী হন। তবে ২০১৪ সালের পর বিএনপির নির্বাচন বর্জন ও আইনি জটিলতায় তিনি নির্বাচনের বাইরে ছিলেন।
১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা খালেদা জিয়া দুই পুত্র—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর জননী। ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সরকার পরিচালনা ও বিরোধী রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।