মায়ের প্রতি দায়িত্বে কি স্ত্রী অবহেলা করছেন?

বাংলা পরিবারে মা ও স্ত্রীর সম্পর্ক প্রায়শই এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলের প্রতি মায়ের যত্ন, ভালোবাসা ও প্রত্যাশা স্বাভাবিক ব্যাপার। অন্যদিকে স্ত্রীও দাম্পত্য জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কিন্তু অনেক পুরুষ মাঝে মাঝে বুঝতে পারেন না যে, মায়ের কথা রাখতে গিয়ে অজান্তে স্ত্রীকে অবহেলা করছেন কি না। এই ধরনের অবহেলা তুচ্ছ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব, অভিমান এবং মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।
এই প্রবন্ধে গবেষণা, পারিবারিক মনোবিজ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হলো।
- মায়ের দায়িত্ব মানে কি স্ত্রীর প্রতি কম দায়িত্ব?
- একজন ছেলে তার মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন:
- স্ত্রীকে সিদ্ধান্তে অংশ না নিতে দেওয়া হয়
- স্ত্রীর মতামত মা’য়ের কথার তুলনায় গুরুত্বহীন মনে করা হয়
- দাম্পত্য সময়, আদর, যোগাযোগ—এসব কমে যায়
- মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, “পারিবারিক সিদ্ধান্তে একজনকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিলে অন্যজন মানসিকভাবে অবহেলিত বোধ করে।”
- যেভাবে অজান্তেই স্ত্রীকে অবহেলা হয়
১) শুধুই মায়ের কথাকেই ‘ফাইনাল’ মনে করা
স্ত্রী কথা বললে মনে হয়, সে বিরোধ করছে। আর মা বললে মনে হয়, ওটাই ঠিক কথা।
এটা দাম্পত্য সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
২) স্ত্রীর প্রয়োজনকে তুচ্ছ করে দেখা
বাজারের খরচ, সন্তান, নিজের মানসিক অবস্থা—এসব বিষয়ে স্ত্রী কথা বললে গুরুত্ব না দেওয়া।
৩) সময়ের অভাব
মায়ের সেবা করতে গিয়ে বা তাঁর সাথে সময় কাটাতে গিয়ে স্ত্রীকে সময় না দেওয়াই অনেক সম্পর্ক ভাঙনের মূল কারণ।
৪) সমালোচনা করা
মায়ের কথায় প্রভাবিত হয়ে স্ত্রীর ছোট ভুলও বড় করে দেখা।
৫) স্ত্রীর আত্মমর্যাদায় আঘাত করা
শাশুড়ি যদি কটূ কথা বলেন, অনেক পুরুষ স্ত্রীর পাশে দাঁড়ায় না। নারী তখন মনে করে, স্বামী তাকে সম্মান দিচ্ছে না।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
গবেষণা ১: ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান
গবেষণায় দেখা গেছে, দাম্পত্য জীবনে তৃতীয় পক্ষের প্রভাব (বিশেষ করে পরিবার) বাড়লে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব বাড়ে। স্ত্রী সাধারণত আবেগজনিত অবহেলাকে বেশি তীব্রভাবে অনুভব করেন।
গবেষণা ২: জার্নাল অব ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি
স্বামী যদি তার মায়ের মতামতকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেন, সেখানে স্ত্রী ৭০% ক্ষেত্রে নিজেকে “secondary partner” মনে করেন।
গবেষণা ৩: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
বাংলাদেশের যৌথ পরিবারের গবেষণায় দেখা যায়,
৬৩% স্ত্রী মনে করেন শাশুড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপে স্বামী দূরে সরে যায়।
৫৪% পুরুষ বলেন, মা’কে কষ্ট না দিতে গিয়েই কখনো কখনো স্ত্রীকে মনঃক্ষুণ্ণ করেন।
গবেষণা ৪: মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য
পরিবারে “অভিমান-দ্বৈততা” তৈরি হলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বামী দুই পক্ষকে খুশি রাখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষকেই সঠিকভাবে বুঝতে পারে না।
স্ত্রীকে অবহেলা না করার উপায়
১) দু’জনের কথাই সম্মান দিন
মা ও স্ত্রী—দু’জনই আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
তাই সিদ্ধান্ত নিন আলোচনা করে।
২) স্ত্রীকে সময় দিন
রাতে ১৫-২০ মিনিট হলেও স্ত্রীর সাথে মন খুলে কথা বলুন।
এটি আবেগগত নিরাপত্তা তৈরি করে।
৩) শাশুড়ি-স্ত্রীর মাঝে স্বামী হলো “ব্রিজ”
শাশুড়ির কোনো অভিযোগ থাকলে আপনি জ্ঞান দিয়ে তা সামলাবেন। স্ত্রীকে দোষ দিয়ে মায়ের মন রক্ষা করা বা উল্টোটা করা—কোনটাই সমাধান নয়।
৪) স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করুন
মায়ের সাথে কথাবার্তায় স্ত্রীকে ছোট করা বা তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন।
৫) স্ত্রীকে পরিবারে মূল্য দিন
যেমন:
- তার মতামত শোনেন
- রান্না বা ঘরের কাজে প্রশংসা করেন
- অতিথি সামনে তাকে গুরুত্ব দেন
৬) সঠিক সীমারেখা তৈরি করুন
মা যাতে দাম্পত্য বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ না করেন, তা বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলা জরুরি।
৭) নিজের অনুভূতি পরিষ্কারভাবে জানান
স্ত্রীরও বোঝা দরকার, মা আপনার দায়িত্ব এবং আবেগের জায়গা। আর আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, স্ত্রী আপনার সঙ্গী—এবং সে আপনার অগ্রাধিকার।
- কেন এই ভারসাম্য জরুরি?
- শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন
- সুস্থ পরিবার
- সন্তানদের মানসিক স্থিতি
- মা-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক মধুর রাখা
- ভারসাম্য ছাড়া সম্পর্ক টেকে না—এটা গবেষণাতেই প্রমাণিত।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। যে পুরুষ দু’জনের মন বুঝে, সম্মান দিয়ে, সময় দিয়ে সম্পর্ক চালায়—তার জীবন যেমন শান্তিময় হয়, পরিবারও তেমন সুন্দর থাকে।
মাকে খুশি করার চেষ্টায় স্ত্রীকে যেন অবহেলা না হয়ে যায়—এই সচেতনতা পরিবারের সুখের ভিত্তি।
দৈএনকে/জে, আ