বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

বিএনপিতে মনোনয়ন লড়াই তীব্র, জামায়াত প্রার্থী চূড়ান্ত

বিএনপিতে মনোনয়ন লড়াই তীব্র, জামায়াত প্রার্থী চূড়ান্ত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

‎আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে ভোটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি , জামায়াতে ইসলামীসহ  অন্যান্য দলগুলো। এই আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দল তাদের প্রার্থী চুড়ান্ত করলেও বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি। কারন এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন অনেকেই।

‎বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম  দক্ষিণ জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক ও আনোয়ারা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরীকে  জামায়াতের  চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। তাদের নেতাকর্মীরা সংগঠনকে বিস্তারের জন্য  কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সেইসঙ্গে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোটও চাইছেন। বর্তমানে নিবন্ধনের সঙ্গে দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লাও ফিরে পেয়েছে জামায়াত। ফলে দলটির প্রচারণায় গতি এসেছে।

‎বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থী অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী বলেন, আমাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। অতীতের যে কোন সময়ের চেয়েও আমাদের সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন বেড়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আশা করি আমরাই বিজয়ী হব্যে। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। সেই সাথে ভোট ডাকাত ও দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্ত প্রস্তুতিও আছে।

‎অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতাকর্মীরা হাইকমান্ডের নির্দেশের অপেক্ষায়। বিএনপি  এখনো প্রার্থী ঠিক না করলেও বিগত ১৬ বছরের নির্যাতনের অবসানের পর নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন তারা। এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা বিভিন্নভাবে দল ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন-এ আসন থেকে তিনবারের নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামান নিজাম, আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন, কর্ণফুলী থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক আলী আব্নাস,দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সাবেক সদস্য ও আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মোস্তাফিজুর রহমান। এই চার  মনোনয়ন প্রত্যাশীর পাশাপাশি এই আসনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা  বিএনপির সাবেক সদস্য  আবু মোহাম্মদ  নিপার। সেই লক্ষ্যে তারা প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে দিনরাত কাজ করে চলেছেন।

এছাড়া জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে (এনডিএম) এর কেন্দ্রীয় জনসংযোগ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি মোহাম্মদ এমরান চৌধুরীও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সক্রিয় রয়েছেন। নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, দল থেকে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়নি। তবে দলীয় মনোনয়নের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।

ছাত্র-জনতার রোষানলে আওয়ামীলীগের  সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর তার দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গীরা আতঙ্কে আছেন। তাদের ভোটের মাঠে নামার এখলে কোনো প্রস্তুতি চোখে পড়েনি। বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গী জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামীক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, সুপ্রীম পার্টিসহ মহাজোটের নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাদের ভোট নিয়ে কোলে চিন্তা নেই। তাছাড়া ইসলামী অন্য দলগুলো এখনো পুরোপুরি মাঠ গোছাতে পারেনি।

‎এদিকে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীতার বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে সাং-গঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে কাজ করে যাচ্ছেন  এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য জুবাইরুণ আলম মানিক। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে এনসিপিকে ঘিরে  ভোটারদের চমৎকার আগ্রহ আমরা দেখতে পাচ্ছি। সে জায়গা থেকে আমরা বলতে পারি সুষ্ঠু নির্বাচন ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারলে এনসিপি এ আসনে এগিয়ে থাকবে।  

নির্বাচনের বিষয়ে কথা হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির  সদস্য এই আসনের তিনবারের সংসদ সদস্য  সরওয়ার জামাল নিজামের সাথে। তিনি বলেন, আমি ১৯৯৬ সাল থেকে একাধারে তিনবার এখানে সংসদ সদস্য ছিলাম। মাঝে গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচন না হওয়ায় নির্বাচনের বাইরে ছিলাম। এবারের নির্বাচনে আমার কর্মকান্ড, আচার-আচরণ মানুষের সাথে সুসম্পর্কের কথা বিবেচনা করেই দল এবং  মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে। দলীয় মনোনয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, এর আগের নির্বাচনগুলোতেও আমার সাথে প্রতিদ্বন্দী  মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন, এবারেও আছেন। তবে আমি মনে করি নির্বাচন করার অধিকার সবার আছে, এটি গণতান্ত্রিক অধিকার। যাকে দিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা সহজ হবে দল তাকে মনোনয়ন দেবে।

‎অন্যদিকে এই আসনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য বহুদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন  চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন। তিনি বিগত হাসিনা সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এখানে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে গিয়ে ছিলেন। দলের মনোনয়ন এর বিষয়ে তিনি বলেন, তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে এসে আমি জেলা বিএন-পির দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তরুনদের বিষয়ে বেশি আগ্রহী। তিনি সব সময় তারুণ্য নির্ভর নেতৃত্ব প্রাধান্য দিচ্ছেন। আমার অতীতের রাজনৈতিক কর্মকান্ডই দল আমাকে আগামী সংসদ নির্বাচনে  আমার জন্মভূমি আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর আসনে মনোনয়ন দিবে বলে আমি আশাবাদী। আমি সুযোগ পেলে আপামর জনতার কণ্ঠস্বর হয়ে সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখব। তবে মনোনয়নের ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। দল যাকে মনোনয়ন দেবে দায়িত্বশীল হিসেবে তার পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখব।

‎ আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহবায়ক আলী আব্বাস বলেন, উপযুক্ত সবার জন্যই মনোনয়ন স্বাভাবিক প্রত্যাশার একটি অংশ, তেমনিভাবে আমারও। ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা যারা গত তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি, তাদের চাহিদাকে সামনে রেখেই দল প্রার্থী বাছাই করবে। সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছেতে আমার আশার জায়গাটা জোরালো। মনোনয়ন পেয়ে বিজয়ী হলে জনগণের জীবনমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্টেকহোল্ডারদের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।  বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী  আনোয়ারা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকায় যৌথভাবে আমার নামও ছিল। তবে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পাতানো নির্বাচনে সেবার দল অংশগ্রহণ করেনি। এবারও আমি দলের মনোনয়ন চাইব। আমার শ্রম, ঘাম আর অর্থনৈতিক ত্যাগ তিতিক্ষার উপর এখানকার জাতীয়তাবাদী শক্তির ভিত্তি মজবুত হয়েছে। এখানকার মানুষের সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক রয়েছে, মানুষের ভালবাসার কারণেই এতদূর আসতে পেরেছি। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে দলকে সুনিশ্চিত বিজয় উপহার দেব এবং এখানকার মানুষ ও অবহেলিত জনপদের উন্নয়নের সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখব। আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য আবু মোহাম্মদ নিপার বলেন, আমি দলের দুঃসময়ের একজন পরিক্ষিত সৈনিক। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও দলের হাইকমান্ড নিশ্চয়ই আমার কর্মকান্ড পর্যালোচনা করে আমাকে মনোনয়ন দিবে।আর আমি মনোনয়ন পেলে অবশ্যই এই আসনটি বিএনপিকে উপহার দিতে পারবো।

‎ভোটাররা বলছেন, বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ জনগণ ভোট। ভোট দিতে পারেনি। দিনের ভোট রাতে হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে সৎ, যোগ্য প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা সম্ভব হবে। এবারের জুলাই গণজগু/খান পরবর্তী নতুন করে হিসাব মেলাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সময়ের ব্যবধানে চারিদিকে সংস্কার আর পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে হায়-জনতার বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছে। ভোটারের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী তরুণ প্রজন্মের ভোট। সাধারণ মানুষের বহুল কাঙ্খিত ভোটাধিকার এবং তরুণ প্রজন্মের নতুন করে পথচলা, কাঙ্খিত ভোটের হিসাব রিবর্তন করে দিতে পারে নিমিষেই।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন