আজকের জেন জি’র চোখে সম্পর্কের প্রতারণা

কিছুদিন আগে কোল্ডপ্লের এক কনসার্টে এক বিলিয়নিয়ার কোম্পানির সিইও ও তার প্রতিষ্ঠানের এইচআর হেডকে ‘অন্তরঙ্গ’ অবস্থায় একসঙ্গে দেখা গেছে। এ ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। যদিও এটি ব্যক্তিগত ব্যাপার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এমন বিষয় গোপন রাখা বেশ কঠিন। এই ঘটনার পর হাস্যরসের ছলে একটি গুরুত্বপুর্ন প্রশ্ন উঠে এসেছে—আজকের দিনে সম্পর্কের প্রতারণা কি বোঝায়?
যেহেতু সম্পর্কের গঠনে এখন আর আগের মতো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, সেখানে নতুন নতুন শব্দ ও ধারণা বেরিয়ে এসেছে। সিচুয়েশনশিপ, গোস্টিং, ব্রেডক্রাম্বিং—এসব শব্দ আমাদের আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। ৮০ বা ৯০-এর দশকে যারা জন্মেছেন, তাদের কাছে সম্পর্কের ধারণা হয়তো অনেকটাই আলাদা ছিল—এটা ছিল ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা, প্রেমের চিঠি লেখা কিংবা পার্কে হাত ধরে হাঁটা। তবে,জিন জি প্রজন্মের কাছে সম্পর্কের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে এবং তাদের কাছে সম্পর্কের ‘প্রতারণা’ও নতুন এক অর্থ বহন করছে।
২১ বছর বয়সী রাদিফা (ছদ্মনাম) মনে করেন,সবারই নিজের জীবনে ‘চষে বেড়ানো ও অভিজ্ঞতা নেওয়ার’ স্বাধীনতা রয়েছে। তার কাছে, যদি তার বয়ফ্রেন্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য মেয়ের ছবি লাইক করেন, তবে তিনি এটাকে ‘চিটিং’ হিসেবে ধরেন না। তিনি বলেন,‘যদি আমরা একে অপরের সঙ্গেই থাকি আর সে অন্য কাউকে ডেটে নিয়ে যায় তবে আমিও আমার সুবিধামতো চলব।’ রাদিফার মতে, সম্পর্কের শেষ উদ্দেশ্য বিয়ে নয় বরং নিজের উন্নতি এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জন করাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে, যদি মনে হয় সঙ্গীটি জীবনে নতুন কিছু যোগ করবে তবেই বিয়ে করা যেতে পারে।
২৫ বছর বয়সী রোহান (ছদ্মনাম), একজন এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত একটি কোম্পানিতে। যিনি বেশিরভাগ সময় তার অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গেই কাটান। তিনি দেখতে পেয়েছেন, অফিসে বেশিরভাগ সহকর্মীই বিবাহিত কিন্তু তাদের সম্পর্কগুলো প্রায়ই গতিশীল থাকে এবং তাদের স্বামী-স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ততার অভাব থাকে। রোহান বলেন,‘সহকর্মীদের সঙ্গে ১৪ ঘণ্টা কাটানোর পর আমি আর কোনো রোমান্টিক সম্পর্কের দিকে মনোযোগ দিতে পারি না। বিশেষ করে বিয়ের মতো কিছুতে।’ তিনি আরও বলেন,‘২০২৫ সালে, সত্যিকারের প্রেম এখনও আছে নাকি?’ রোহান বেশ মজা করে বলেন,‘অনেক সিরিয়াস সম্পর্কের পর মনে হয়েছে একজনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা আসলে খুবই কঠিন কাজ, আর যদি অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ থাকে, তবে সেটা করাই ভালো।’
যদিও সম্পর্কের মধ্যে প্রতারণা সাধারণত নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়, কিন্তু বর্তমান সময়ে তরুন-তরুনীদের মধ্যে এর অনেকটাই পরিবর্তন ঘটেছে। সঙ্গী বা সঙ্গিনী যদি অন্য কাউকে ভালোবাসে কিংবা তাদের সম্পর্কের মধ্যে কিছু সমস্যা থাকে তাহলে তাদের সম্পর্কের গতি পরিবর্তন হতে পারে।
বয়সভিত্তিক পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে পুরোনো প্রজন্ম মনে করে, সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো বিশ্বস্ততা, সেখানে তরুণ প্রজন্ম অনেকসময় বিষয়টিকে অনেক বেশি নমনীয়ভাবে দেখে। তারা সম্পর্কের জন্য ‘সিরিয়াস’ মনোযোগ বা সময় না দেয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছে এবং তাদের কাছে সম্পর্কের ‘গতি’ অনেকটাই আলাদা। কিছু ক্ষেত্রে, সম্পর্কের মৃত্যু ঘটে তৃতীয় ব্যক্তির আগমনের মাধ্যমে, যা অনেকের জন্য অত্যন্ত অবান্তর মনে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের সংজ্ঞা পাল্টাচ্ছে। আগের প্রজন্ম অবাক হয়ে দেখছে বর্তমান প্রজন্মের প্রেম এবং প্রতারণার ধারণা।
এই নতুন যুগের সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য কী, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু একথা সত্য যে, বর্তমান প্রজন্ম সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি খোলামেলা, নমনীয় এবং পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবর্তন হচ্ছে সম্পর্কের সংজ্ঞায়, সম্পর্কের মাপকাঠি ও প্রবণতা—এই বিষয়গুলো দিনে দিনে নতুনভাবে গড়ে উঠছে।
দৈএনকে/জে, আ