দুর্ঘটনায় আহতকে হাসপাতালে নিলে মামলা থেকে সুরক্ষা পাবেন উদ্ধারকারী

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মানবিক সহায়তাকারীর বিরুদ্ধে দুর্ঘটনাজনিত ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা করা যাবে না—এমন বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর খসড়ায়। এমনকি আহত ব্যক্তির মৃত্যু হলেও শুধু তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার কারণে সহায়তাকারীকে দায়ী করা যাবে না। সাধারণ মানুষকে উদ্ধারকাজে উৎসাহিত করতে ‘গুড সামারিটান’ বা মানবিক উদ্ধারকারীদের জন্য এ আইনি সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সময়কে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এই সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি ও গুরুতর শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা কিংবা আদালতে হাজিরার আশঙ্কায় অনেকেই আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে চান না। ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে অনেক দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তির অবস্থা।
এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা, হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো খসড়া আইনে গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ৬২ ধারায় দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোটরযানের চালক, কন্ডাক্টর বা তাঁদের প্রতিনিধিকে নিকটস্থ থানায় দুর্ঘটনার খবর জানানো এবং আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বিধান লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে সাধারণ নাগরিকের মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নতুন প্রস্তাব করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বাসসকে বলেন, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ যেন পিছিয়ে না যান, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা জরুরি। গুড সামারিটান সুরক্ষার প্রস্তাবের মাধ্যমে উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি সৎ উদ্দেশ্যে মানবিক বিবেচনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার, প্রাথমিক সহায়তা প্রদান কিংবা হাসপাতালে স্থানান্তর করলে সেই সহায়তার ফলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতি বা মৃত্যুর জন্য তাঁকে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলায় দায়ী করা যাবে না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাহমিদুর রহমান বলেন, মানবিক কারণে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলে তা সাধারণ মানুষকে উদ্ধারকাজে উৎসাহিত করবে। তবে প্রকৃত মানবিক সহায়তা, ইচ্ছাকৃত ক্ষতি এবং গুরুতর অবহেলার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে আইনে সুরক্ষার সীমা স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার নিশ্চিত করতে কমিউনিটি ভলান্টিয়ার ও অ্যাম্বুলেন্স দল গঠনের প্রস্তাবও রয়েছে খসড়া আইনে। এসব দল দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। পাশাপাশি আহত ব্যক্তিকে উপযুক্ত হাসপাতালে নেওয়া এবং গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে আহত ব্যক্তির প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ৬২ ধারায় দেশব্যাপী টোল-ফ্রি টেলিফোন নম্বর চালুর বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, চালক, মালিক, যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জরুরি উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবার জন্য সহায়তা চাইতে পারবেন।
তবে কার্যকর উদ্ধারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী, হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসাসক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।
সড়ক নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর খসড়ায় দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা ও উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সড়কের নকশা, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুল নকশা বা অনিরাপদ অবকাঠামোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পথচারীদের নিরাপত্তায় ফুটপাত, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে। মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী উভয়ের হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, শিশু পরিবহনে নিরাপত্তাবিধি প্রণয়ন এবং সাইকেল আরোহীদের জন্য পৃথক লেন তৈরির প্রস্তাব রয়েছে খসড়ায়।
এ ছাড়া নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের উপযোগী সড়ক ও গণপরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকের ভুল বা অসতর্কতাকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সড়কের নকশা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহনের কারিগরি অবস্থা, গতিসীমা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ সব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনের ৯৮ ধারায় বেপরোয়া চালনা, নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহনের কারণে দুর্ঘটনায় জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতি হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে ১০৫ ধারায় বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত চালনায় গুরুতর আহত বা প্রাণহানির ঘটনায় নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
প্রস্তাবিত নতুন আইনের অন্যতম লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভূমিকা রাখা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, গুড সামারিটান সুরক্ষা কার্যকর হলে দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে সাধারণ মানুষের ভয় ও দ্বিধা কমবে। তবে এ বিধানের অপব্যবহার ঠেকাতে সৎ উদ্দেশ্যে সহায়তার শর্ত, ইচ্ছাকৃত ক্ষতি ও গুরুতর অবহেলার ক্ষেত্রে দায় এবং উদ্ধারকারীর পরিচয় সংগ্রহের প্রক্রিয়া আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যক্ষদর্শী, পথচারী কিংবা চালকের তাৎক্ষণিক উদ্যোগে বেঁচে যেতে পারে একটি প্রাণ। তাই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি নিরাপদ অবকাঠামো, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা এবং মানবিক উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করেই কার্যকর সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সূত্র: বাসস