শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • মদিনা থেকে জেদ্দা যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা, প্রাণ গেল ৭ বাংলাদেশির লাখো নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে ঢাকায় বিএনপির সার্বভৌমত্ব র‌্যালি ‘হাবিবি’ নামে রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি গড়লেন যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সিনেটর ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৬৭৪ গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশে আসার পথে গরমে দুই সদস্যের মৃত্যু, পরিবার পাবে ৩ লাখ টাকা বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি হৃদয়ের ৭ নভেম্বর উপলক্ষে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা বরবাদ’ সিনেমার নির্মাতার সাথে প্রেমের গুঞ্জন, যা বললেন দীঘি ডিপিডিসির জুরাইন দপ্তরের জিম্মিদশা: পিওন মোশাররফের অপকর্ম অবৈধ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ  ‘৭ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের ম্যাগনাকার্টা’: প্রধানমন্ত্রী
  • ৭ নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের উত্থানের ইতিহাস

    ৭ নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমানের উত্থানের ইতিহাস
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। ওই দিন সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে পরিচিত এ ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামরিক বাহিনীর পরবর্তী গতিপথেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।

    ৭ নভেম্বরকে বিএনপি ও এর অনুসারীরা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে। তাঁদের দৃষ্টিতে, দিনটি ছিল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ। অন্যদিকে, ইতিহাসের এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় মতভেদ রয়েছে। তবে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ধারাবাহিক ঘটনাগুলো যে দেশকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছিল, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ কম।

    ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। এরপর তাঁর সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। সদ্য বিদায়ী সরকারের অধিকাংশ মন্ত্রী নতুন সরকারের সঙ্গে যুক্ত হন। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহসহ নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

    ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা বঙ্গভবনে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। তাঁদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একাংশের দূরত্ব ও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান। একই সময়ে তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদ তৈরি করা হয়। বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক খলিলুর রহমানকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

    এরপর সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নভেম্বরের শুরুতে এই অস্থিরতা কয়েকটি বড় ঘটনার জন্ম দেয়। ২ নভেম্বর রাতে সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়াত জামিলকে সঙ্গে নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটান। ওই রাতেই জিয়াউর রহমানকে তাঁর বাসায় সস্ত্রীক গৃহবন্দি করা হয় এবং সেনাপ্রধানের পদ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

    ৩ নভেম্বর ভোরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সমর্থনে ঢাকার আকাশে সামরিক বিমান মহড়া দেয়। পরে জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তা—ফারুক, রশীদ ও ডালিমসহ ১৫ জনকে বিশেষ বিমানে ব্যাংকক যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

    একই দিন আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা—তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। ১৫ আগস্টের পর গ্রেপ্তার হওয়া এই চার নেতাকে কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে জেলহত্যা দিবস হিসেবে স্মরণ করা হয়।

    ৪ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। ওই দিন ঢাকায় একটি মিছিল হয়, যাতে আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ ও তাঁর মা অংশ নেন। সেনাবাহিনীর একটি অংশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ঘটনা নিয়ে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও সন্দেহ তৈরি হয়। ৪ নভেম্বর রাতে খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন এবং তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। ৬ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।

    এদিকে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করার ঘটনায় সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ পাল্টা অভ্যুত্থানে অংশ নেয়। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের অনুসারী ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’। সংগঠনটি সেনাবাহিনীর ভেতরে সক্রিয় ছিল এবং জাসদের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

    ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সদস্যরা মেজর মহিউদ্দিন ও সুবেদার মেজর আনিসুল হকের নেতৃত্বে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করেন। তাঁকে সেনানিবাসে দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারির সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে কর্নেল তাহেরও উপস্থিত হন। তবে জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসের বাইরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাহেরের পরিকল্পনা সফল হয়নি।

    কর্নেল তাহের ও তাঁর অনুসারীদের লক্ষ্য এবং জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক-সামরিক অবস্থান নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা ব্যাখ্যা এসেছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে বলা হয়েছে, তাহের সেনাবাহিনীর প্রচলিত কাঠামো বদলে বিপ্লবী ধাঁচের বাহিনী গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রচলিত শৃঙ্খলা ও কমান্ড কাঠামো ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। ওই সময় সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডও ঘটে, যা ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে আরও রক্তক্ষয়ী করে তোলে।

    ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান সামরিক বাহিনীতে নিজের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পরে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেন।

    ৫১ বছর পরও ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। কারও কাছে দিনটি সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও জাতীয় সংহতির প্রতীক, আবার কারও কাছে এটি ছিল ধারাবাহিক সামরিক অভ্যুত্থান, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রক্তপাতের একটি পর্যায়। তবে ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামরিক বাহিনী এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

    সূত্র: বাসস


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন