বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • ঢাকায় ৩৩ স্থানে প্রতিমা বিসর্জন, নিরাপত্তায় ১৬ হাজারের বেশি পুলিশ রাজধানীতে ৫৪৫ সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের তালিকা পুলিশের হাতে ডেঙ্গুতে আরও ৭ মৃত্যু, হামের উপসর্গে একজনের মৃত্যু ফাইনালের আশা বাঁচাতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া বাসায় মাসে ২২টি ডিজে পার্টি, আটক ৮৫ সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, আগে কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ সুন্দরবন, মোংলা বন্দর ও বেজা ইকোনমিক জোন পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫১৮ জলবায়ু নীতিতে ঘাটতি, শতাব্দীর শেষে উষ্ণতা বাড়তে পারে ২.৮ ডিগ্রি জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা লুটেরা ও চাঁদাবাজদের জন্য রক্ত দেয়নি: শফিকুর রহমান
  • সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রস্তুত, দুর্ঘটনায় আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রস্তাব

    সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়া প্রস্তুত, দুর্ঘটনায় আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রস্তাব
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জরুরি মুহূর্তে বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সে ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা চালুসহ বিভিন্ন বিধান রেখে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। একই অপরাধ বারবার করলে দ্বিগুণ শাস্তি বা জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাবও রয়েছে এতে।

    সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) প্রস্তুত করা খসড়া আইনের মূল লক্ষ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো গড়ে তোলা। খসড়ায় ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা ও দুটি তফসিল রয়েছে।

    ‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সংস্থাপন শাখার উপসচিব আল-আমীন মো. নুরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

    সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। তবে বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন। দুই সংস্থার পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

    খসড়া আইনে সড়ক দুর্ঘটনাকে ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাব উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

    ২০২৭ সালের মধ্যে আইন প্রণয়নের লক্ষ্য

    বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এ অঙ্গীকার করা হয়।

    চলতি বছরের ২০ ও ২১ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম অঙ্গীকারটি পুনর্ব্যক্ত করেন।

    এর ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা ও বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করে খসড়া তৈরির জন্য একটি কমিটি গঠন করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। গত ১৪ অক্টোবরের এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে আইনটি চূড়ান্ত করতে সরকার কাজ করছে। এ ছাড়া চলতি বছরের মধ্যে গতি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ও হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশিকা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

    সড়ক অবকাঠামো ও প্রযুক্তির ব্যবহার

    খসড়া আইনে সড়ক ও মোড় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নির্মাণ, পরিবহনব্যবস্থার সমন্বয় এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাক স্পট’ নিয়মিত চিহ্নিত করে সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

    পথচারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে পর্যাপ্ত ফুটপাত, র‌্যাম্প বা লিফটসহ ফুটওভার ব্রিজ এবং নিরাপদ রিফিউজ আইল্যান্ড নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। নারী, অন্তঃসত্ত্বা, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণপরিবহনে যাতায়াত সহজ করতে পরিবহন পরিচালনাকারীদের জন্য বাধ্যবাধকতা রাখার কথাও বলা হয়েছে।

    গতি নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় গতি পরিমাপক ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, রাম্বল স্ট্রিপ এবং ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সড়ক নিরাপত্তার স্টার-রেটিং পদ্ধতি অনুসরণ এবং সড়ক পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও পরিদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে।

    গাড়ি চালানোর সময় মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করলে শাস্তি

    প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন বা একই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার, ধূমপান, খাবার খাওয়া কিংবা উচ্চ শব্দে গান শোনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। চালকের মনোযোগ বিঘ্নিত করে—যাত্রীদের এমন আচরণও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।

    চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্য সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। ১৪ বছরের কম বয়সী অথবা ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুদের সামনের আসনে বসানো নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি উপযুক্ত সুরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।

    মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার বিধানও রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশ ও অনুমোদিত কর্মকর্তারা চালকের ব্রেথ অ্যানালাইজার বা পরীক্ষাগারে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারবেন।

    চালক ও আরোহীর হেলমেট বাধ্যতামূলক

    মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী—উভয়ের জন্য বিএসটিআই অনুমোদিত মানসম্মত হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের মোটরসাইকেলের যাত্রী হিসেবে বহন নিষিদ্ধ করার কথাও বলা হয়েছে।

    সড়কের অবস্থা অনুকূল হলে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ এবং সাইকেল চালকদের হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। পথচারীদের ফুটপাত ব্যবহার এবং জেব্রা ক্রসিং ও রিফিউজ আইল্যান্ডের মতো নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপারও বাধ্যতামূলক করার কথা রয়েছে।

    ডিমেরিট পয়েন্ট ও দ্বিগুণ শাস্তি

    প্রস্তাবিত ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট কাটা যাবে। নির্ধারিত সীমায় পয়েন্ট পৌঁছালে লাইসেন্স বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

    একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ নির্ধারিত শাস্তি বা জরিমানা দ্বিগুণ করার প্রস্তাবও রয়েছে খসড়ায়। প্রস্তাবিত ৭৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো পথচারী ফুটপাত ব্যবহার না করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

    দুর্ঘটনার পর ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ বিনামূল্যে চিকিৎসা

    খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, দুর্ঘটনার পর সংকটপূর্ণ প্রথম সময় বা ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা। এ জন্য হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে অগ্রিম টাকা বা টিকিট ছাড়াই তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা দিতে বাধ্য করার বিধান রাখা হয়েছে।

    খসড়ায় বলা হয়েছে, বর্তমান আইনি কাঠামোয় দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের বাধ্যতামূলক বিধানের ঘাটতি রয়েছে। নতুন আইনে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা হলে আহতদের জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়বে।

    উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা

    দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে এগিয়ে এলে পুলিশি হয়রানি, ফৌজদারি মামলা বা আদালতে হাজিরার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকেই সাহায্য করতে দ্বিধা করেন। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে খসড়ায় স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারীদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা থেকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

    এর লক্ষ্য হলো, আইনি জটিলতার ভয় ছাড়াই সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করা।

    কেন্দ্রীয় ডেটাবেস ও গবেষণা তহবিল

    সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রকাশ ও সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মান অনুসারে একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডেটাবেস গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করবে।

    এ ছাড়া বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করা এবং সড়ক নিরাপত্তার উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য আলাদা গবেষণা তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা তদন্ত, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ এবং যাত্রীবিমার বিষয়ও খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

    আইনের দুটি তফসিলে দুর্ঘটনার পর সেবা প্রদান এবং অ্যালকোহল বা অন্য মাদকদ্রব্য সেবন করে যানবাহন চালানোর বিষয়ে বিধিবিধান যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

    কেন পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন

    খসড়ায় বলা হয়েছে, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-তে আরও সংশোধনী আনলেও সড়ক প্রকৌশল, যানবাহনের মান, গতি ব্যবস্থাপনা, পথচারীর নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা, গবেষণা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্তভাবে সমাধান করা কঠিন।

    এ কারণে বৈশ্বিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইনটি প্রণয়ন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ সড়ক নির্মাণ এবং ঝুঁকি কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হবে।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন