সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, আগে কিছু জানায়নি কর্তৃপক্ষ

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া, আইনি সহায়তা এবং সাজা কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে আগে জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেটের ভাষ্য, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশির মামলার বিস্তারিত তথ্য দেয়নি। তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা কিংবা তা কার্যকরের বিষয়েও বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
এ ঘটনায় বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে দোভাষীর সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দা বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টসহ অন্যান্য আদালতে শুনানির সময় অনুবাদের কাজে ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহাদ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হয়। তবে এসব আদালতে বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে অনুবাদক নিয়োগ করা হয় না। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় আসামিপক্ষের বক্তব্য বোঝা এবং কার্যকরভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কনস্যুলেটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দা কনস্যুলেটের আওতাধীন পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের একটি তালিকা পাঠায় সৌদি কর্তৃপক্ষ। ওই তালিকায় নজরুল ইসলাম আব্দুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম পাওয়া যায়। তবে তাঁদের সাজার মেয়াদ উল্লেখ ছিল না।
নজরুল ইসলাম আব্দুল বশিরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায়। সুইটি আক্তার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের বাসিন্দা। তাঁরা দুজনই সৌদি আরবের আল মাজাল কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
কনস্যুলেটের কাছে থাকা তালিকা অনুযায়ী, নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সাইবার অপরাধের অভিযোগে আটক করা হয়। তাঁকে জেদ্দা সংশোধনাগারে রাখা হয়েছিল। তালিকায় তাঁর বিরুদ্ধে রায় হওয়ার তথ্য থাকলেও সাজার বিবরণ উল্লেখ ছিল না।
অন্যদিকে, সুইটি আক্তারকে ২০২৩ সালের ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে আটক করা হয়। তিনি জেদ্দা মহিলা কারাগারে ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও রায় হওয়ার তথ্য তালিকায় রয়েছে, তবে সাজার মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি।
তালিকার সপ্তম কলামে রায়প্রাপ্ত বন্দিদের সাজার বিবরণ দেওয়ার কথা থাকলেও এই দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে তা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কনস্যুলেট। তাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় ও তা কার্যকরের বিষয়ে আগে কোনো তথ্য না পাওয়ার বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। কনস্যুলেটের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে সাইবার অপরাধ ও জেনা বা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নজির আগে ছিল না।
আইনি সহায়তা ও দোভাষীর সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ
বিদেশে আটক নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় কনস্যুলার যোগাযোগ ও আইনি সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভিয়েনা কনভেনশনের আওতায় কনস্যুলার কর্মকর্তাদের আটক নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ ও দেখা করা এবং তাঁর আইনি সহায়তার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এ অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতি ও সীমা সংশ্লিষ্ট বিধান এবং দেশের আইনের ওপর নির্ভর করে।
জেদ্দা কনস্যুলেটের চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের আদালতে শুনানির সময় অনুবাদের জন্য নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হলেও বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে অনুবাদক সরবরাহ করা হয় না। ফলে অভিযুক্ত বাংলাদেশি নাগরিকেরা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ কতটা বুঝতে পারছেন এবং নিজেদের বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, সৌদি আরবে গুরুতর অপরাধে আটক বাংলাদেশিদের পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণত আইনি সহায়তা চেয়ে আবেদন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা সরাসরি বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলে আবেদন করতে পারেন। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেও আবেদন করা যায়।
তবে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কোনো আবেদন করা হয়নি। তাঁদের পরিবারের কেউ কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগও করেননি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পশ্চিম সৌদির কারাগারে আটক ৩০৬ বাংলাদেশি
কনস্যুলেটের কাছে থাকা তালিকায় সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে বিভিন্ন চারিত্রিক মামলায় আটক ৩০৬ জন বাংলাদেশির তথ্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত।
এ ছাড়া মক্কায় সাইবার অপরাধের তিনটি পৃথক মামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়ার তথ্যও তালিকায় রয়েছে।
নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের মামলার নথি, বিচারপ্রক্রিয়ায় দোভাষীর সুযোগ, আইনি সহায়তার ব্যবস্থা এবং সাজা কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জেদ্দা কনস্যুলেটের চিঠিতে এসব বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।