গাজীপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, আধিপত্য-চাঁদাবাজি ঘিরে বাড়ছে সহিংসতা

গাজীপুর ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এসব অপরাধী চক্রের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে।
গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী, জয়দেবপুর, চৌরাস্তা, কোনাবাড়ী, বোর্ডবাজার, মাওনা ও ভবানীপুরসহ প্রায় ১৯টি এলাকাকে কিশোর অপরাধের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এসব এলাকায় কিশোরদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অন্য জেলা থেকে গাজীপুরে নতুন আসা কিংবা অস্থায়ীভাবে বসবাসকারী মানুষদের অনেক সময় টার্গেট করছে এসব চক্র। পথচারীদের থামিয়ে তল্লাশির নামে ভয় দেখানো, মাদক দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি, মারধর ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী কেড়ে নেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষ করে মাস শেষে বেতন পাওয়া পোশাকশ্রমিক এবং এলাকার সঙ্গে পরিচিতি কম—এমন নতুন বাসিন্দাদের অনেক সময় সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শিল্পাঞ্চলের মিল-কারখানার ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ডেও কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ কিশোরদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে নতুন ব্যবসায়ী কিংবা একা বসবাসকারী আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টার ঘটনাও ঘটছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ভিডিও তৈরির সময় দেশীয় অস্ত্র এবং কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভবানীপুর ও বানিয়ারচালা এলাকায় অস্ত্র প্রদর্শনের কয়েকটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথাও জানা গেছে।
মহাসড়ক ও শিল্পাঞ্চলের অপেক্ষাকৃত অন্ধকার সড়ক ও গলিতে পথচারী, পোশাকশ্রমিক ও ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ছিনতাই ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সংঘাতের পেছনে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা বড় কারণ। নিজেদের দলের নেতা বা ‘ডন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা থেকে একাধিক গ্রুপের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। আবার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকসমাগম বাড়ানো কিংবা প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার জন্য কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিশোরদের ব্যবহার করেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ ও আয়ের উৎসে পরিবর্তন আনার চেষ্টা থেকেও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদারের প্রভাব পড়েছে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রেও। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ জনের ধারণক্ষমতার এই কেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় ৭০০ কিশোর রয়েছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে তাদের যথাযথ কাউন্সেলিং ও সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সী অপরাধীদের সঙ্গে গুরুতর অপরাধে জড়িত কিশোরদের একই পরিবেশে রাখলে সংশোধনের বদলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার বা আটক নয়, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা জোরদার করাও জরুরি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানতে গাজীপুরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের পেছনে থাকা কথিত ‘বড় ভাই’ বা মূলহোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তাদের মতে, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক উদ্যোগ, শিক্ষা ও কর্মমুখী কার্যক্রমও বাড়াতে হবে। শুধু কিশোরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; অপরাধের পেছনের মাদক, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়গুলোও মোকাবিলা করতে হবে।