কারিগরি ত্রুটির আড়ালে নাশকতা বা ষড়যন্ত্র আছে কি না খতিয়ে দেখতে হবে: রিজভী

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সংকট ও কারিগরি ত্রুটির ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, এসব ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা, নাশকতা নাকি কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করতে কোনো ধরনের চক্রান্ত হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ১২ দলীয় জোট আয়োজিত ‘দেশের চলমান সংকট ও দেশপ্রেমিক শক্তির করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের সমালোচনা করা, সংসদে ও সংসদের বাইরে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলা এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া। তবে বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীন বা অহেতুক কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনা-সমালোচনা সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয় না। তাই বিরোধী দলকে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ও বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়েই কথা বলা উচিত।
দেশের গ্যাস, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র ছয় মাস দায়িত্বে রয়েছে। তাই দীর্ঘদিনের এসব সংকটের জন্য সরকারকে সরাসরি দায়ী করা ঠিক হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে। এর প্রভাব পড়ছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানিতেও।
মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, সেখানে কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সেটি সচল করতে কাজ চলছে এবং শিগগিরই স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইভাবে ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বিকল হওয়ায় সেখান থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘একের পর এক কারিগরি ত্রুটি হচ্ছে, কোথাও একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—এটা কেন হচ্ছে? মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এটা কোনো ঘটনা, রহস্য, নাশকতা বা ষড়যন্ত্র কি না, সেটিও ভাবতে হবে।’
রিজভীর ভাষ্য, সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা পরিশোধ করছে। ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহসংক্রান্ত চুক্তির আওতায় তাদের পাওনাও দেওয়া হচ্ছে। এরপরও কেন ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
রংপুরের সাম্প্রতিক একটি ঘটনার প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, সেখানে একই পরিবারের হিন্দু সম্প্রদায়ের চার সদস্য হত্যার শিকার হয়েছেন। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ডের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে দরিদ্র, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পরিবারের নারী অভিভাবকের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ পরিবারের কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যাও ৬১ লাখ থেকে ৬২ লাখ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশের তীব্র খাদ্যসংকট মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান গণমুখী নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। খাল খননের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এসব কাজে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
ফারাক্কার প্রভাবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবেশগত নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে দাবি করে রিজভী বলেন, এর ফলে মাটির উর্বরতা কমেছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের ঝুঁকি বেড়েছে এবং মাছ, গাছপালা, পানি ও জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আবারও ব্যাপকভাবে খাল খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকারের প্রথম ছয় মাসেই এক কিলোমিটারের বেশি খাল খনন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রিজভীর অভিযোগ, সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিকে আড়াল করা বা সেগুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিতে কোনো কৌশল নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রিজভী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আবারও প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছে। কীভাবে এত মানুষ জড়ো হলো এবং গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি জানে কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে রিজভী বলেন, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই হতে দেওয়া উচিত নয়।
২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, তাদের রক্তের ওপর দিয়ে দেশে আবারও সহিংস রাজনীতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না। ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন রিজভী। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধেও সমালোচনা হতে পারে, তবে তা গঠনমূলক হওয়া প্রয়োজন। অপপ্রচার ও চরিত্রহননের রাজনীতি থেকে সবাইকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় ১২ দলীয় জোটের নেতাদের প্রশংসা করে রিজভী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে জোটের নেতারা ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রবীণ রাজনীতিক মোস্তফা জামাল হায়দারের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও অধিকারসংক্রান্ত আইন নিয়েও কথা বলেন রিজভী। তিনি বলেন, এ আইনের মাধ্যমে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা হয়নি। বরং বৃদ্ধ বাবা-মা যেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সম্মান ও শান্তির সঙ্গে থাকতে পারেন, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাবা-মাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা উল্লেখ করে আইনটিকে ‘যুগান্তকারী’ বলে মন্তব্য করেন বিএনপির এই নেতা।