যে চিঠিটি নিজেই নিজেকে লিখে ফেলেছিল

গ্রামের নাম ছিল নীলপাথর। মানচিত্রে ঠিকঠাক জায়গা ছিল না, কিন্তু বাতাসে ছিল এমন এক অদ্ভুত গন্ধ—যেন পুরোনো কালি আর ভেজা স্মৃতির মিশ্রণ।
সেই গ্রামে ডাকপিয়ন ছিল একজনই—তার নাম নুরুল। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু চোখে এখনো কৌতূহল ছিল স্কুলপড়ুয়া ছেলের মতো। সে চিঠি বিলি করত, কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—নীলপাথর গ্রামে কেউ কখনো চিঠি লেখত না।
তবু প্রতিদিন সকাল আটটায় তার ব্যাগে একটা চিঠি এসে হাজির হতো।
কোনো প্রেরকের নাম নেই। কোনো ঠিকানা নেই। শুধু খামের ওপর লেখা—
“নুরুলের জন্য”
প্রথম দিন সে ভেবেছিল কেউ হয়তো মজা করছে। দ্বিতীয় দিন ভাবল ভুল। তৃতীয় দিন সে খাম খুলল।
ভিতরে লেখা ছিল—
“আজ তুমি নদীর ধারে যাবে না। যাবে পাহাড়ি রাস্তার শেষ মোড়ে।”
নুরুল অবাক হলো। কারণ সে সত্যিই প্রতিদিন নদীর ধারে যায়। এটা কেউ জানল কীভাবে?
সে গেল না।
সেদিন রাতে গ্রামে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল—নদীর ধারে যেখানে সে সাধারণত যায়, সেখানে একটি গাছ হঠাৎ ভেঙে পড়ে পুরো পথ বন্ধ করে দিল। যদি সে সেখানে থাকত, বিপদ নিশ্চিত ছিল।
পরদিন আবার চিঠি।
“আজ যাবে নদীর ধারে। কিন্তু আগের জায়গায় নয়, বাঁশঝাড়ের পেছনে।”
নুরুল এবার ভয় পেল। কিন্তু গেল।
সেখানে সে পেল একটি পুরোনো লোহার বাক্স। ভিতরে ছিল তারই লেখা কিছু চিঠি—হুবহু তার হাতের লেখায়, কিন্তু তার মনে নেই কখন লিখেছিল।
তার মাথা ঘুরে গেল।
পরদিন চিঠিতে লেখা—
“তুমি এখন বুঝতে পারছো। তুমি ডাকপিয়ন নও, তুমি শুধু পৌঁছে দাও।”
নুরুল আর কিছু বুঝতে পারল না।
সেদিন থেকে চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু নীলপাথর গ্রামে নতুন ঘটনা শুরু হলো—মানুষের ভবিষ্যৎ লেখা চিঠি আসতে শুরু করল। কেউ জানত না কে লিখছে। শুধু খামের ওপর লেখা থাকত—
“তোমারই লেখা, তোমারই জন্য”
আর প্রতিটি চিঠি ঠিক সময়মতো মানুষকে বাঁচিয়ে দিত, আবার কখনো তাদের এমন পথে নিয়ে যেত, যেটা তারা নিজেরাও চায়নি।
বছর শেষে নুরুল একদিন নদীর ধারে বসে ছিল। হঠাৎ তার পকেটে একটি খাম।
ভেতরে কিছুই লেখা নেই।
শুধু একটা আয়না রাখা।
আর আয়নায় সে দেখল—সে নিজেই এখন একটি চিঠি লিখছে, যেটা সে কখনো লেখেনি, কিন্তু সবসময় লিখে এসেছে।