শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • রাজধানীর জোয়ারসাহারায় চালু হলো ‘স্বপ্ন’র নতুন আউটলেট মতভেদ যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, জাতীয় ঐক্যে জোর প্রধানমন্ত্রীর স্বাধীনতা পুরস্কার দিতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে ২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা চাইলেন তারেক রহমান জিরো এমিশন ইস্যুতে বক্তব্য দিলেন প্রধানমন্ত্রী লো-ফিডে উৎপাদন অব্যাহত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের নিয়ন্ত্রণে কড়া সমালোচনা উইজডেনের অনলাইন ক্লাস না চাইলেও বাস্তবতায় বাধ্য: শিক্ষামন্ত্রী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত গিরিশ চন্দ্রের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর হাসনাতের সঙ্গে কী হয়েছিল বিস্তারিত জানালেন মনজুর আলম
  • অপেক্ষার সুর

    অপেক্ষার সুর
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমি, বিকেলের শেষ আলোটা তখন ধীরে ধীরে শহরের গায়ে মিশে যাচ্ছে। আকাশে হালকা কমলা আর বেগুনি রঙের মিশেল—দেখতে যেন একটা নীরব ছবির মতো। চারপাশে মানুষজনের ভিড়—রিকশার বেল, গাড়ির হর্ন, রাস্তার দোকানদারদের ডাক—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা।

    তবুও সেই ব্যস্ততার মাঝেও আমার মনটা সেদিন অদ্ভুতভাবে খালি খালি লাগছিল। যেন কিছু একটা নেই, অথচ কী নেই তা বুঝতে পারছিলাম না।

    ঠিক তখনই চোখে পড়ল তাকে।

    রাস্তার এক কোণে, একটু ভাঙা ফুটপাথের ওপর বসে আছেন এক বৃদ্ধ। পরনে মলিন পাঞ্জাবি, চোখে পুরোনো চশমা। সামনে রাখা একটা ছোট্ট টিনের বাক্স, আর হাতে একটা হারমোনিকা। তিনি ধীরে ধীরে একটা সুর বাজাচ্ছিলেন।

    সুরটা ছিল অদ্ভুত।

    না খুব আনন্দের, না খুব দুঃখের—কিন্তু শুনলে মনে হয় যেন কোথাও কোনো গল্প লুকিয়ে আছে। আশেপাশের এত শব্দের মাঝেও সেই সুরটা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল, যেন সব কোলাহলকে ঠেলে সে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে।

    আমি থেমে গেলাম।

    কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলাম। আশেপাশের মানুষজন কেউ খেয়ালই করছে না তাকে। কেউ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউ তাকিয়েও দেখছে না। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, এই সুরটা শুধু আমার জন্যই বাজছে।

    আমি একটু এগিয়ে গেলাম।

    “চাচা, আপনি প্রতিদিন এখানে বসেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    বৃদ্ধ সুর থামালেন না, শুধু চোখ তুলে তাকালেন। তার চোখে ছিল এক ধরনের গভীরতা—যেন অনেক কিছু দেখেছেন, অনেক কিছু হারিয়েছেন।

    কিছুক্ষণ পর তিনি হারমোনিকা নামিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ বাবা, প্রতিদিনই আসি।”

    “কেউ শোনে?” আমি অবাক হয়ে বললাম।

    তিনি একটু দূরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেউ কেউ থামে… বেশিরভাগই থামে না। কিন্তু আমি বাজাই।”

    “কেন?” আমার কৌতূহল বেড়ে গেল।

    বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “অনেক বছর আগে… এই শহরের এই জায়গাতেই আমি একজনের সাথে দেখা করতাম। প্রতিদিন বিকেলে। সে গান খুব পছন্দ করত। আমি হারমোনিকা বাজাতাম, আর সে চুপ করে শুনত।”

    আমি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম।

    “একদিন সে আর এল না,” বৃদ্ধ বললেন, কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু এক ধরনের শান্ত দুঃখ। “তারপরও আমি আসা বন্ধ করিনি। ভাবলাম, হয়তো কোনো একদিন আবার আসবে… অথবা হয়তো কেউ আসবে, যে এই সুরটা চিনবে।”

    আমি ধীরে ধীরে বসে পড়লাম তার পাশে।

    “আপনি এখনও তার জন্য অপেক্ষা করেন?” আমি নরম গলায় জিজ্ঞেস করলাম।

    বৃদ্ধ হেসে বললেন, “অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না বাবা। মানুষ চলে যায়, কিন্তু অপেক্ষা থেকে যায়। আমি এখন শুধু তার জন্য না… সেই সময়টার জন্যও অপেক্ষা করি।”

    তার কথা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো, আমিও তো কিছু একটা হারিয়েছি। হয়তো কোনো মানুষ, হয়তো কোনো সময়, হয়তো নিজেরই একটা অংশ।

    আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে তার টিনের বাক্সে রাখলাম। তিনি কিছু বললেন না, শুধু আবার হারমোনিকাটা ঠোঁটে তুলে নিলেন।

    আবার সেই সুর বাজতে শুরু করল।

    কিন্তু এবার সুরটা অন্যরকম লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এতে শুধু একজন মানুষের গল্প না—অসংখ্য মানুষের অপেক্ষা, স্মৃতি আর না বলা কথার মিশ্রণ আছে।

    আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম।

    হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছনে তাকালাম। বৃদ্ধ এখনও বসে আছেন, একইভাবে, একই জায়গায়, একই সুর বাজাচ্ছেন। আশেপাশের মানুষজন এখনও ব্যস্ত, কেউ থামছে না।

    কিন্তু আমি জানতাম—আজ আমি থেমেছিলাম।

    আর হয়তো সেই কারণেই, আমার ভেতরের খালি জায়গাটা একটু হলেও ভরে গেছে।

    রাস্তা দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। শহরটা আগের মতোই আছে—কোলাহল, ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়। তবুও সবকিছু যেন একটু বদলে গেছে।

    মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই এই শহরের কোনো না কোনো কোণে বসে আছি—কেউ হারমোনিকা বাজাচ্ছি, কেউ শুনছি, আর কেউ না বুঝেই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি।

    হয়তো একদিন, আমিও থেমে যাবো কোনো এক অচেনা সুরের সামনে।

    আর তখন বুঝতে পারবো—আমি আসলে কী খুঁজছিলাম এতদিন।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ