গোপালগঞ্জে অবকাঠামো আছে, সেবা নেই!

তিনতলা ভবনের ভেতরে আলো জ্বলছে, দেয়ালে নতুন রঙের গন্ধ, কোণায় সাজানো অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি। শয্যাগুলো সারিবদ্ধ; ওয়ার্ডে টেবিল-চেয়ারও প্রস্তুত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, রোগী এলেই শুরু হবে চিকিৎসা।
কিন্তু ভেতরের এই প্রস্তুতির পর থমকে রয়েছে সবকিছু।
কারণ, এখানে নেই চিকিৎসক, নেই নার্স, নেই এ সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম। গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার কৃষ্ণাদিয়া গ্রামের তফুরন্নেছা রাজ্জাক ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটি এমন অবস্থার একটি উদাহরণ মাত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার পাচটি উপজেলায় নির্মিত ১০ শয্যার সাতটি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র এখনও চালু হয়নি। প্রায় ৩২ কোটি টাকার সরকারি ব্যয়ে গড়া কেন্দ্রগুলো বছরের পর বছর ধরে তালাবদ্ধ।
নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক কেন্দ্রে দুইজন চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ একাধিক স্বাস্থ্যকর্মী ও সহায়ক কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো থাকলেও জনবল না থাকায় তা কার্যত অচল।
গোপালগঞ্জ স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জেলার পাচটি উপজেলায় এসব কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০১৮ সালে চারটি, ২০২১ সালে একটি এবং ২০২২ সালে আরো দুটি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রত্যেক কেন্দ্রে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, শয্যা ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল বরাদ্দ না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
কেন্দ্রগুলো রয়েছে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা, টুংগিপাড়া উপজেলা, কোটালিপাড়া ও কাশিয়ানি, মুকসুদপুর উপজেলার খান্দারপাড় ইউনিয়ন ও বহগ্রাম এবং মুকসুদপুর উপজেলার কৃষ্ণাদিয়া এলাকায়।ভেতরে জমছে ধুলা।
স্থানীয়দের ভাষায়, গ্রামে এমন একটি আধুনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে উঠবে, সেই আশায় জমি দান করা হয়েছিল। ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, হস্তান্তরও হয়েছে। কিন্তু কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের ভরসা এখনও সেই জেলা শহর, যেখানে যেতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে।
গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার পশারগাতি ইউনিয়নের কৃষ্ণাদিয়া গ্রামে অবস্থিত কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে দেখা যায়, আধুনিক তিনতলা ভবন প্রস্তুত থাকলেও সেখানে চিকিৎসাসেবা নেই। ভবনের পাশেই চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক সুবিধাসহ আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
এই কেন্দ্রটির নাম তফুরন্নেছা রাজ্জাক শেখ ১০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। ২০১৮ সালে কেন্দ্রটির ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০২২ সালে কাজ শেষ করে পরিবার পরিকল্পনা দপ্তরের কাছে তা হস্তান্তর করা হলেও এখনও শুরু হয়নি এর কার্যক্রম।
কৃষ্ণাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওমর মোল্লা বলেন, গ্রামে চিকিৎসা মিলবে ভেবে আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু এখনও অসুস্থ হলে শহরে যেতে হয়। এই কেন্দ্র থাকলেও যেন নেই।
একই অভিজ্ঞতা অন্যদেরও। কৃষ্ণাদিয়া কেন্দ্রের পাশের মসজিদের ইমাম মো. শহীদুল বলেন, এত বড় ভবন খালি পড়ে থাকা দেখলে খারাপ লাগে। এটি চালু থাকলে অন্তত আশপাশের মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা পেত।
মুকসুদপুর এর কৃষ্ণাদিয়া কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ভেতরের সরঞ্জাম নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছে, ব্যবহার না হওয়ায় যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের ভেতর অব্যবস্থার চিহ্নও স্পষ্ট। একদিকে নতুন ভবন, অন্যদিকে খালি ওয়ার্ড। এক পাশে সাজানো যন্ত্রপাতি, আরেক পাশে সেবার অপেক্ষা। মাঝখানে কেবল জনবলের ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণ না হলে কোটি টাকার এসব স্থাপনা কেবলই নীরব প্রাচীর হয়ে থাকবে।
স্থানীয়দের মতে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো চালু হলে শুধু মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবাই নয়, পুরো উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপও কমে আসতো। প্রসূতি সেবা, জরুরি অস্ত্রোপচার এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সহজলভ্য হলে জেলা শহরের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে যেতো।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। অবকাঠামো সম্পূর্ণ হলেও জনবল বরাদ্দ না থাকায় সেবা কার্যক্রম শুরুই করা যায়নি।
গোপালগঞ্জ পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সোহেল পারভেজ বলেন, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর অনেক আগেই এসব কেন্দ্র আমাদের কাছে হস্তান্তর করেছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এখনও সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছি।