দিনের পর দিন ক্লান্তি ও পেশি দুর্বলতা, কি শুরু হয়েছে সারকোপেনিয়া?

বাড়ি থেকে অফিসের ব্যস্ত জীবনের মাঝে দিনে ৪০–৪৫ মিনিট ব্যায়ামের জন্য সময় বের করা অনেকেরই চাট্টিখানি কথা নয়। তদুপরি, ঠিক কোন ধরনের ব্যায়াম করবেন, তা ঠিক করতে গিয়ে সময় চলে যায়। অফিসে টানা ৮–৯ ঘণ্টা বসে কাজ করলে শরীরের ক্ষতি হয়, যা সহজেই বোঝা যায় না। বয়স ত্রিশ পেরোলেই পায়ে-কোমরে ব্যথা শুরু হতে পারে; উঠা-বসার সময় যন্ত্রণা হয়।
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার ফলে আরও একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে—‘অফিস চেয়ার বাট সিনড্রোম’। এতে নিতম্বের পেশির গঠন বদলে যায়, ফলে শরীরের আকৃতি পরিবর্তিত হয়। এই সবই পেশি ক্ষয়জনিত সমস্যা। আগে যা বার্ধক্যের সঙ্গী হিসেবে ধরা হতো, এখন তা অনেক কম বয়সেই দেখা যাচ্ছে। এই রোগটির নাম সারকোপেনিয়া। অল্প পরিচিত হলেও, এটি বেশির ভাগ মানুষের শরীরে ইতোমধ্যেই জাঁকিয়ে বসেছে।
সারকোপেনিয়া কী?
বয়সকালে পেশির ক্ষয়, হাড়ের ক্ষয়জনিত রোগ বেশি হয়। কিন্তু অল্প বয়সেও যদি এমনটা হয়, তা হলে সেটি চিন্তার বইকি। ধরুন, ৩০ থেকে ৩৫ বছর যাঁর বয়স, তাঁর যদি পেশির ক্ষয় হতে থাকে, তা হলে কী হবে? একাধারে শরীর দুর্বল হবে, হাতে-পায়ে বাতের মতো যন্ত্রণা শুরু হবে, একই সঙ্গে হাড়ের গঠনও দুর্বল হতে থাকবে। ফলে আজ স্লিপ ডিস্ক, তো কাল অস্টিয়োপোরোসিসের মতো রোগ হানা দেবে। পেশি বা হাড়ের যাবতীয় রোগের কারণই কিন্তু এই সারকোপেনিয়া। পেশির শক্তি যখন কমতে থাকে ও অকালেই পেশি ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, তখন সেই অবস্থাকে বলে সারকোপেনিয়া। এক বার যা শুরু হলে হাঁটাচলা করা, দৌড়নোর ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। শরীরের ভারসাম্য রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে।
পুরুষ না মহিলা, কাদের ঝুঁকি বেশি?
মহিলাদের সারকোপেনিয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণটা ইস্ট্রোজেন হরমোন। মহিলাদের শরীরে এই হরমোনটি যাবতীয় গুরুদায়িত্ব পালন করে। পেশির জোর বৃদ্ধি, হাড়ের শক্তি সবই নির্ভর করে এর উপরে। ইস্ট্রোজেনের শক্তি যত কমতে থাকবে, ততই পেশির ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়বে। মহিলাদের শরীরে হরমোনের বদল খুব তাড়াতাড়ি ঘটে। তা ছাড়া যাঁরা প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খান, অতিরিক্ত ধূমপান করেন বা অ্যালকোহলের নেশা বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে হরমোনের বদল আরও তাড়াতাড়ি ঘটে। কম পরিশ্রম, একটানা বসে থাকার কারণেও সমস্যা বাড়ে। সব মিলিয়ে ইস্ট্রোজেনের শক্তিক্ষয় হতে থাকে এবং পেশির ক্ষয় বাড়তে থাকে।
লক্ষণ খুব চেনা
রোগটির নাম অচেনা হলেও, লক্ষণগুলি কিন্তু খুব চেনা। অকারণে দুর্বলতা সারকোপেনিয়ার অন্যতম লক্ষণ। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরেও যদি ক্লান্ত লাগে, ঝিমুনি আসে, তা হলে বুঝতে হবে পেশির শক্তি কমছে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে কষ্ট, কয়েক কদম উঠেই হাঁপিয়ে যাওয়া সারকোপেনিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
হাতের জোর কমে যাবে। হাতের কব্জি, আঙুলে ব্যথা হবে। কোনও কিছু ধরতে গেলে বা হাত মুঠো করতে গেলেও ব্যথা হবে।
হজমশক্তি কমবে। সারকোপেনিয়া থেকে লিভারের রোগও হতে পারে।
ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা কমবে, শরীরে মেদ জমতে থাকবে। একই সঙ্গে হাড়ের জোর কমবে।
সারকোপেনিয়ার থাবা থেকে বাঁচতে সুষম আহার যেমন জরুরি, তেমনই প্রয়োজন শরীরচর্চা। কোনও রকম ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট কার্যকরী হবে না। বরং নিয়মিত শরীরচর্চা, হাঁটা, জগিং উপকারে আসবে। ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল খেতে হবে। খাদ্যতালিকায় রাখুন কলা, কঠবাদাম, আখরোট, দুগ্ধজাত দ্রব্য, গাজর, বিন ইত্যাদি। ভিটামিন এ, ডি এবং ই, পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার পেশির শক্তি বৃদ্ধি করবে।