ঢাকার আইসিইউতে ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাকের বিস্তার

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ওষুধ প্রতিরোধী ছত্রাক ‘ক্যানডিডা অরিস’ ছড়িয়ে পড়ছে—এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ছত্রাক শুধু নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) নয়, বরং গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। ফলে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ (হাসপাতাল-অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন) বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) আইসিডিডিআর,বি এসব তথ্য প্রকাশ করে।
মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম জার্নালে প্রকাশিত এ গবেষণা ঢাকার একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে পরিচালিত হয়। এতে সহযোগিতা করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এবং কারিগরি সহায়তা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)।
২০২১ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৭২ জন আইসিইউ রোগীকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভর্তি হওয়ার পর এবং আইসিইউতে অবস্থানকালে রোগীদের ত্বক ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ক্যানডিডা অরিস শনাক্ত করা হয়। সন্দেহভাজন নমুনা ভিটেক-২ পদ্ধতিতে নিশ্চিত করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, আইসিইউতে থাকার কোনো এক পর্যায়ে প্রায় ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে ক্যানডিডা অরিসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী আইসিইউতে থাকার সময়ই সংক্রমিত হয়েছেন, যা থেকে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণের ইঙ্গিত মেলে।
সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি—প্রায় ১৩ শতাংশ। বেসরকারি হাসপাতালে এ হার প্রায় ৪ শতাংশ। সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পার্থক্য এর অন্যতম কারণ হতে পারে বলে গবেষকরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক তুলনায় ঢাকার এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে এ হার সাধারণত ০.৫ শতাংশেরও কম।
গবেষণায় আরও বলা হয়, গুরুতর অসুস্থ, দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকা এবং মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন বা সেন্ট্রাল/ইউরিনারি ক্যাথেটারের মতো ইনভেসিভ চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ঝুঁকি বেশি। যথাযথ জীবাণুনাশ ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এসব পদ্ধতি সংক্রমণ বাড়াতে পারে।
ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, সব নমুনাই ফ্লুকোনাজলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী এবং প্রায় সবই ভরিকোনাজলের বিরুদ্ধেও কার্যকর নয়। কিছু জীবাণু একাধিক অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ দেখিয়েছে, যা চিকিৎসাকে জটিল করে তুলছে।
আইসিডিডিআর,বি-এর এএমআর রিসার্চ ইউনিটের প্রধান ও গবেষণাটির প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, ক্যানডিডা অরিস এখন সব ধরনের আইসিইউ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। হাসপাতালের ভেতরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে।
গবেষকরা হাসপাতালের পরিবেশ নিয়মিত ক্লোরিনভিত্তিক জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার রাখা, স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটে নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন।
তাদের মতে, ঢাকাসহ সারাদেশে এ সমস্যার প্রকৃত বিস্তৃতি বুঝতে বৃহৎ পরিসরের আরও গবেষণা প্রয়োজন।