ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সাবেক মডেলের, অস্বীকার হোয়াইট হাউসের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগ তুলেছেন সাবেক মডেল ও সাবেক মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউল। ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের অপরাধ এবং তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের কথিত সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বিয়াত্রিস কিউলসহ পাঁচ নারীর বক্তব্যের সারাংশ রয়েছে। ওই নারীরা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ অথবা যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাট সদস্যদের কমিটির কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে একাধিক দফায় সাক্ষাৎকারে কিউল তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য, ২৪ বছর বয়সে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা-সংক্রান্ত একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সে সময় হোটেলটির মালিক ছিলেন ট্রাম্প।
কিউলের অভিযোগ, ট্রাম্প তাঁকে ভিসার ব্যবস্থা এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘আমি তোমার দেখাশোনা করব।’
কিউলের দাবি, ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথনের পরপরই এপস্টিন তাঁর কাছে আসেন। নিজেকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিচয় দিয়ে এপস্টিন তাঁকে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের মার-আ-লাগো ক্লাবে একটি পার্টিতে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক পার্টি আয়োজনের কথাও এপস্টিন বলেছিলেন বলে কিউলের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের এক প্রতিনিধি তাঁকে প্লাজা হোটেলের ওপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানান বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কিউলের অভিযোগ, ওই কক্ষে যাওয়ার পর ট্রাম্প পিছন থেকে তাঁকে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এ সময় তাঁর পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তক্ষরণ ও কালশিটে দাগ তৈরি হয় বলে তিনি দাবি করেছেন। ঘটনাটিকে ‘নিষ্ঠুর’ বলেও বর্ণনা করেছেন কিউল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কথিত নির্যাতনের পর ট্রাম্প তাঁকে বিছানার কিনারায় বসান এবং ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনরায় দেন। পাশাপাশি তাঁকে চুপ থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন কিউল।
আগের বক্তব্যে ভিন্ন বিবরণ
২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রথমবার প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার সময় কিউল বলেছিলেন, ১৯৯৩ সালে প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাঁকে যৌন হেনস্থা করেছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প তাঁর ঠোঁট ও ঘাড়ে চুমু খেয়েছিলেন, পোশাক তোলার চেষ্টা করেছিলেন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করেছিলেন।
তবে সে সময় কিউল বলেছিলেন, ঘটনাটি এর বেশি দূর এগোয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ট্রাম্পকে আগে কথা বলার কথা বলেছিলেন এবং এরপর ট্রাম্প থেমে যান। নিজের শারীরিক উচ্চতা তাঁকে আরও গুরুতর যৌন আক্রমণ থেকে রক্ষা করে থাকতে পারে বলেও সে সময় মন্তব্য করেছিলেন সাবেক এই মডেল।
ডেইলি মেইলের আগের এক প্রতিবেদনে কিউলের দীর্ঘদিনের এক বন্ধুর বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই বন্ধু দাবি করেছিলেন, প্রায় ২০ বছর আগেই কিউল তাঁকে ট্রাম্পের অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আচরণের কথা জানিয়েছিলেন। বন্ধুর ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী বছরগুলোতে কিউল ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে নিজের বক্তব্য পরিবর্তন করেননি।
অভিযোগ অস্বীকার হোয়াইট হাউসের
২০২৪ সালে কিউলের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট সেগুলোকে ‘ভুয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন। নতুন প্রতিবেদন প্রকাশের পরও হোয়াইট হাউস অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্রের দাবি, এপস্টিন-সংক্রান্ত কোনো বিষয়েই ট্রাম্পকে দায়ী করা যায় না এবং এ বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে অভিযোগমুক্ত। মুখপাত্র প্রতিবেদনটিকে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্পের সাফল্য থেকে মার্কিন নাগরিকদের মনোযোগ সরাতেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।
ট্রাম্পও এর আগে দাবি করেছেন, এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই তিনি তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। এপস্টিনকে ‘বিকৃত রুচির মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করার পাশাপাশি তাঁকে মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দেওয়ার কথাও বলেছেন ট্রাম্প।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিতর্ক
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ ও সেগুলো সামলানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিও রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী না হলেও তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগগুলো ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনে তুলে ধরা বক্তব্য ও দাবি। এগুলোকে আদালতে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। হোয়াইট হাউস অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে।