বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার: আইনমন্ত্রী

সাড়ে ৪ হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার: আইনমন্ত্রী
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

গত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও সংবিধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ৪ হাজার ৫০০-এর বেশি ভিন্নমতাবলম্বী বা রাজনৈতিক কর্মী বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান।

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ দাবি করেন। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালাম, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক আইনের শাসনের জন্য লড়াই করা প্রায় ৭০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬০ লাখের বেশি মানুষ রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর দাবি, এসব ঘটনায় করা মামলার প্রায় ৯৯ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছে।

বর্তমান সরকারের সময়ের প্রসঙ্গ তুলে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, গত ছয় মাসের বেশি সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করেছে। এ ধরনের ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে—এমন কোনো অভিযোগও তারা পাচ্ছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে সংবিধান আমাদের পথ দেখানোর মূল ভিত্তি। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের তুলনা করে তিনি বলেন, ১৭৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের শুরুতে লেখা হয়েছে ‘উই, দ্য পিপল অব আমেরিকা’। একইভাবে ১৯৭২ সালের বাংলাদেশের সংবিধানেও ‘উই, দ্য পিপল অব বাংলাদেশ’ লেখা হয়েছে। তাঁর মতে, দুই সংবিধানের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের মূল ভিত্তি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা। মতপ্রকাশ, সমাবেশ, চলাচল ও সংগঠনের স্বাধীনতাও এর অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সংবিধানও মৌলিক কিছু ভিত্তি ও কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারণার মিল রয়েছে।

মারবারি বনাম ম্যাডিসন মামলার প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৮০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ওই মামলায় বিচারিক পর্যালোচনার নীতি প্রয়োগ করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনেও সুপ্রিম কোর্ট একই ধরনের এখতিয়ার প্রয়োগ করছে। তবে কখনো কখনো এ এখতিয়ারের অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগও হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে জন লক, টমাস হবস ও মন্টেস্কুর রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এসব তত্ত্বের প্রভাব রয়েছে।

সংবিধান নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তীব্র আলোচনা ও মতপার্থক্য ছিল। বাংলাদেশের সংবিধান নিয়েও শুধু আইনজ্ঞদের মধ্যে নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের দোকানেও আলোচনা হয়। সংবিধানের বিভিন্ন বিধান, সংশোধনী ও প্রয়োগ নিয়ে সাধারণ মানুষের আলোচনা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সংকটের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজনের সময় বাংলাদেশের জনগণের পাশে থাকা, কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার ও আটকানোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন। সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতার পক্ষেও দেশটির অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, দেশে আরও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার আইন করেছে। আইনের কিছু ধারা নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি। তবে জনগণের অধিকার সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানান।

তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইনে ‘ওএফসিএটি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের বাছাই কমিটিতে প্রেসক্লাব ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিধান রাখা হয়েছে। অন্যান্য কিছু দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বাছাই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ধরনের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে স্পিকার থাকছেন এবং বিরোধী দলের নেতাদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সরকার সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সুশাসন বর্তমান সময়ে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে অর্থনীতি ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিচার সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ‘কোনো ব্যক্তি আমাদের লক্ষ্য নয়, আমাদের লক্ষ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করা’—বলেন তিনি।

চলমান বিচারপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, এসব অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক নির্বাহীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এবং এসব প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ প্রমাণিত হবে বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সময় বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও মতপার্থক্য ছিল। সংবিধানের শক্তি সবাই সব বিষয়ে একমত হওয়ায় নয়; বরং মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করতে পারার মধ্যে রয়েছে।

তিনি ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক সংশোধনের সুযোগকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের স্থায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উল্লেখ করেন।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন