চাঁদপুরে বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের খাবারে অনিয়ম

বাক ও শ্রবণশক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে তারা চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে পারে না। আর এই সুযোগটিই যেন লুফে নিয়েছে একদল অসাধু চক্র। চাঁদপুরের সরকারি বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারে ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বহীনতার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। নির্ধারিত খাদ্যতালিকা (ডায়েট চার্ট) তোয়াক্কা না করে শিক্ষার্থীদের নামমাত্র ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে তদন্তে জানা গেছে, ডায়েট চার্ট অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পাতে ১০৫ গ্রাম ওজনের মাছ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ গ্রামের ছোট মাছ। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় ফ্রিজে রাখা পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত মাছ রান্না করে পরিবেশন করা হয়। বিদ্যালয়ের বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ইশারার মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের আকার-ইঙ্গিতে স্পষ্ট যে, তারা প্রতিদিন পেটপুরে খাবার পায় না এবং যা পায় তার মানও অত্যন্ত নিম্ন।
খাবারের এই নয়ছয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তা এখন মারামারিতে রূপ নিয়েছে। তথ্যমতে, গত ১৯ এপ্রিল রাতে ১৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য রান্না করা হয় মাত্র ১৫ টুকরো মাংস। অর্থাৎ ৪ জন শিক্ষার্থী মাংস ছাড়াই খাওয়ার কথা। এই অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদ করেন বিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী মো. এনামুল হক। এ নিয়ে ধর্মীয় শিক্ষক কবির আহমেদের সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়, যা একপর্যায়ে রক্তাক্ত সংঘর্ষে গড়ায়। এতে শিক্ষক কবির আহমেদ মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং এনামুল হকও আহত হন।
শিক্ষার্থীদের পেটে লাথি মেরে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদার ভরত চন্দ্র ঘোষের বিরুদ্ধে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, দফায় দফায় অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও অদৃশ্য ইশারায় তিনি বারবার সরকারি কার্যাদেশ পেয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি চাঁদপুর জেলা কারাগার এবং সরকারি শিশু পরিবারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে খাদ্য সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, এই ঠিকাদারের পেছনে প্রভাবশালী কোনো মহলের আশীর্বাদ রয়েছে, যার কারণে একের পর এক অপরাধ করেও তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন।
এই বিষয়ে মন্তব্য নিতে ঠিকাদার ভরত চন্দ্র ঘোষের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হ্যাপী আক্তার কিছু অনিয়মের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে নিজের দায় কিছুটা এড়িয়ে তিনি বলেন, "আমি প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়মের মধ্যে আনার চেষ্টা করছি। তবে পারিবারিক কারণে সবসময় উপস্থিত থাকতে পারি না।"
চাঁদপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, "কিছু বিষয় আমার নজরে এসেছে। আমরা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। সত্যতা প্রমাণিত হলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই কোমলমতি শিশুদের সাথে এমন প্রতারণাকে 'মানবিক অপরাধ' হিসেবে দেখছেন চাঁদপুরের বিশিষ্টজনেরা। তারা বলছেন, যারা কথা বলতে পারে না, তাদের হকের খাবার চুরি করা চরম নৈতিক অবক্ষয়। অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।