সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল

বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও জাতীয় সংসদে তিনটি সুপ্রিম কোর্ট সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অন্তর্ভুক্ত।
আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে এ দুটি বিল পাস হয়েছে।
এর মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হয়।
আর ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
ফলে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না।
বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি হল যেভাবে
বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন মহল থেকে করা হচ্ছিল। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা ও সভা-সমাবেশের মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেন ও তার সহকর্মীরা বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন।
সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত রায় দেয়।
সেই রায়ের ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার পদক্ষেপ গত বছর ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সররকারের অনুমোদন পায়। তার ১০ দিনের মাথায় ৩০ নভেম্বর 'সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি হয়।
এ অধ্যাদেশ পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার পর নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলাজনিত বিষয়, ছুটির পাশাপাশি নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগের সব কিছু সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় করবে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ সচিবালয় উদ্বোধন করেন তখনকার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ’
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তখন আপত্তি জানান বিরোধী সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।
পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এই সদস্য বলেন, “বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।”
তার ভাষায়, “ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের আয়োজন চলছে।”
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাজিবুর রহমান বলেন, বিচার বিভাগ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কিছু বিচারককে শোকজও করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আগে মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হতো, এখন সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
জামায়াতের এ সদস্য বলেন, হাইকোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল।
তার ভাষায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তন অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে এবং মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত’ হয়েছে। সে অনুযায়ী বিচারিক কার্যসম্পাদনকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, “সে রায় বাস্তবায়িত হয়ে গিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। সেখানে রায়টি স্থগিত হওয়া কিংবা বাতিল হওয়া ছাড়া এটিকে বিলুপ্ত করা, সেই সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার জন্য বিল আনা বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আদালত অবমাননার শামিল।”
এই সদস্য বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোরও প্রস্তাব দেন।
তিনি বলেন, “রহিতকরণ বিলটি অসাংবিধানিক। এটা কোনোভাবেই পাস করা যাবে না।”
নাজিবুর রহমান বলেন, সংসদ সার্বভৌম বলে আদালতের রায় না মানার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তা জনমত বিভ্রান্ত করছে।
তিনি একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের কেউই সার্বভৌম নয়; সংবিধানের সীমার মধ্যেই তাদের কাজ করতে হয়। তার ভাষায়, কোনো আইন সংবিধানবিরোধী হলে আদালত সেটি বাতিল করতে পারে।
বিরোধী দলের এ সদস্য বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়নি। সে অবস্থায় এখন রহিতকরণ বিল আনা জনগণের সঙ্গে ‘প্রতারণার’ শামিল।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রিম কোর্ট কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা বলতে পারে; কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করতে ‘ডিক্টেট’ করতে পারে না।
মাসদার হোসেন মামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আদালত আইন নিয়ে মত দিতে পারে, কিন্তু আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জামায়াতের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরা চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। সেই স্বাধীনতা যেমন অ্যাবিউজড হয়েছে, যারা সে বিচার করেছিলেন তারা সবচেয়ে স্বাধীন বিচারক ছিলেন।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সুরক্ষা সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত।
তবে তার ভাষায়, সেই সুপ্রিম কোর্ট থেকেই ‘শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ’ এর জন্ম হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিচারের অভিযোগও উঠেছে।
খালেদা জিয়ার সাজার প্রসঙ্গ টেনে আসাদুজ্জামান বলেন, “সে সুপ্রিম কোর্ট বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী, গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছর থেকে ১০ বছর জেল দিয়েছিলেন।”
রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ চালানোর অভিযোগও তোলেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, এত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট একজন বিচারকের বিরুদ্ধেও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেয়নি।
বিচারকদের শোকজের ব্যাখ্যা
বিচারকদের শোকজ দেওয়ার অভিযোগের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কেউ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না।
তার ভাষায়, কেউ কেউ ক্লাস নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, কেউ কেউ ফেইসবুকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হিসেবে হাজির হচ্ছেন। সে কারণেই তাদের বিষয়ে নোটিস দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের মতো প্রশ্নে আরও আলোচনা ও যাচাই-বাছাই দরকার।
পরে কণ্ঠভোটে নাজিবুর রহমানের আপত্তি নাকচ হয় এবং বিলটি পাস হয়।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলেও আপত্তি
পরে আইনমন্ত্রী ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ পাসের জন্য প্রস্তাব করেন। এতে আপত্তি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সদস্য আখতার হোসেন।
রংপুর-৪ আসনের এই সদস্য বলেন, অতীতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, তাতে ‘দলীয় আনুগত্যসম্পন্ন ও বিতর্কিত’ ব্যক্তিরাও বিচারপতির পদে যেতে পেরেছেন।
আইনমন্ত্রীর আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিচারপতিরা সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েও কীভাবে ‘রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে’ বিচারকার্য চালিয়েছেন, কীভাবে বেগম খালেদা জিয়ার সাজার বাড়ানো হয়েছে এবং কীভাবে বিচারব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার গোড়াতেই সমস্যা ছিল।
আখতার হোসেন বলেন, “এই যে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ তৈরি হল, খায়রুল হকের মতো বিচারপতি তৈরি হল, মানিকচোরা শব্দটা এখানকার জন্যে অশোভনীয় হতে পারে, কিন্তু বাইরে এই শব্দটা এভাবেই চলছে।”
তার ভাষায়, বিচারক নিয়োগের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই কারণেই শেখ হাসিনার আমলে ‘মানিক চোরার মতো ব্যক্তিরা’ বিচারপতি হতে পেরেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বিচারক নিয়োগের বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো বোঝাতে তিনি ঘুড়ির নাটাইয়ের উদাহরণ টানেন।
তার ভাষায়, “কোনো একটা ঘুড়িকে আপনি আকাশে উড়িয়ে দিয়েছেন, সেই ঘুড়ির নাটাই যদি আপনার হাতে থাকে, ঘুড়িকে আপনি যতই উড়ার স্বাধীনতা দেন না কেন, আকাশের মধ্যে সেই ঘুড়ি সেখানেই পাক খাবে, আপনি যখন টান দেবেন, তখন আপনার কাছেই ফিরে আসবে।”
আখতার হোসেন সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ ও ৪৮ অনুচ্ছেদে প্রধান বিচারপতি ও বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়ে কি বলা হয়েছে, তা তুলে ধরেন।
তার ভাষায়, এই কাঠামোর কারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত নিয়োগ সম্ভব হয়েছে।
এনসিপির এ সদস্য বলেন, “সেই ধরনের একটা পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামনের দিনে চলুক, এটা তো আমরা কেউই চাই না।”
আখতার হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আনা অধ্যাদেশে বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করা হয়েছিল।
তার মতে, ওই অধ্যাদেশে বয়স, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চারিত্রিক গুণাবলী ও প্রকাশনার মতো যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা অতীতে ছিল না।
আখতার হোসেন বলেন, অধ্যাদেশটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণার জন্য রিট হয়েছিল, কিন্তু আদালত তা খারিজ করে দিয়েছিল।
তার ভাষায়, “সেই অধ্যাদেশের মধ্যে কোনো অসাংবিধানিকতা নাই।”
আখতারের বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, তাত্ত্বিকভাবে তিনি বিরোধী সদস্যের বক্তব্যের সঙ্গে একমত যে অতীতে বিচারপতি নিয়োগে ভয়াবহ সমস্যা ছিল।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে গত ১৭ বছরের মধ্যে ফ্যাসিস্ট আমলে পার্টি ক্যাডারদেরকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে খায়রুল হকের জন্ম হয়েছে।”
মন্ত্রী বলেন, সরকারও চায় বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হোক, ভালো বিচারপতি নিয়োগ হোক, সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক।
তবে তার ভাষায়, অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি আগে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ছিল তৎকালীন সরকারের পক্ষে আইনি অবস্থান তুলে ধরা। এখন তিনি এই সরকারের মন্ত্রী, আর সরকারের নীতি হল-বিচার বিভাগে নিয়োগে ‘সম্পূর্ণরূপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’ নিশ্চিত করা।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিচারক নিয়োগের বিষয়টি সংবিধানে নয়, আইনে করার কথা বলেছে। সেই অবস্থান থেকেই সরকার বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের পথে যেতে চায়।
তার ভাষায়, “আমরা বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়ন করব।…আমরা সংবিধান সংশোধনের যে বিশেষ কমিটি করতে চাচ্ছি, আমরা সেই কমিটির কাছে ফিরে যাই।”
তিনি বলেন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, মানদণ্ড, কাঠামো ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সব প্রশ্নই সেই আলোচনায় আসতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো মানিকের জন্ম হোক। আমরা চাই না বাংলাদেশে আর কোনো খায়রুল হক গজায় উঠুক। আমরা চাই না আর কোনো বিচার বিভাগীয় কিলিং হোক।”
পরে কণ্ঠভোটে আখতার হোসেনের আপত্তি নাকচ হয়ে যায়। বিলটিও পাস হয়।
বিল পাসের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, আলোচনার সময় একজন বিচারপতির নামের শেষে একটি বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছিল, সেটি সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিলে যা আছে
সংসদে পাস হওয়া ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং ২০২৬ সালের এর সংশোধন অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে।
বিলে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ‘অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই’ দরকার হওয়ায় এই রহিতকরণ বিল আনা হয়েছে।
বিল অনুযায়ী, অধ্যাদেশ দুটির অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে।
একই সঙ্গে সচিবালয়ের হাতে থাকা বাজেট, গৃহীত প্রকল্প ও কর্মসূচি আইন ও বিচার বিভাগে হস্তান্তরিত হবে। সচিবালয়ের জন্য সৃজিত পদও বিলুপ্ত হবে।
তবে অধ্যাদেশ বাতিলের পরও সুপ্রিম কোর্ট, রেজিস্ট্রি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, অধস্তন আদালত ও অন্যান্য দপ্তরের জন্য সৃজিত পদ, সাংগঠনিক কাঠামো, যানবাহন ও অফিস সরঞ্জাম বহাল থাকবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সেগুলো আইন ও বিচার বিভাগে ন্যস্ত হবে।
বিলে আরও বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চাকরি অধ্যাদেশ জারির আগে যে আইনে পরিচালিত হতো, বাতিল হওয়ার পর আবার সেই আইনের অধীনেই তা পরিচালিত হবে।
অন্যদিকে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬’-এ গত বছরের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তবে ওই অধ্যাদেশের অধীনে এরই মধ্যে করা নিয়োগ ও নেওয়া ব্যবস্থাগুলো বৈধ বলেই গণ্য হবে বলে বিলে বলা হয়েছে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিচারক স্বল্পতা দূর করতে জারি করা ওই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে ২৫ জন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সরকার বলছে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের জন্য স্থায়ী আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করতে এবং অধ্যাদেশের বিধানগুলো আরও যাচাই-বাছাই করতে এই রহিতকরণ বিল আনা হয়েছে।
সে কারণে অধ্যাদেশটি বাতিল হলেও এর অধীনে সম্পন্ন নিয়োগপ্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বৈধতা অক্ষুণ্ন রাখতে হেফাজতের বিধান রাখা হয়েছে।
ক্রীড়া খাতে তিন বিল পাস
অধিবেশনের শুরুতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুল হক ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াবিদ কল্যাণ ফাউন্ডেশন সংশোধন বিল, ২০২৬’ এবং ‘শেখ হাসিনা জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট সংশোধন বিল, ২০২৬’ সংসদে পাসের জন্য তোলেন। পরে বিল তিনটিই পাস হয়।
জ্বালানি ও ক্রয় আইনে সংশোধনী
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সংশোধন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করলে তা পাস হয়।
এরপর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট সংশোধন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
অভিবাসন ও শ্রম আইনেও পরিবর্তন
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর পক্ষে প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নুরুল হক ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী সংশোধন বিল, ২০২৬’ এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম সংশোধন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতিতে পাস হয়।
স্থানীয় সরকার ও আইনগত সহায়তা
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর পক্ষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করলে তা পাস হয়।
পরে আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ‘আইনগত সহায়তা প্রদান সংশোধন বিল, ২০২৬’ সংসদে তোলেন। সেটিও কোনো সংশোধনী ছাড়াই পাস হয়।