শৈল্পিক বাবুই পাখির বাসা বিলুপ্তির পথে

গ্রামবাংলার মেঠো পথ ধরে হাঁটলে একসময় চোখে পড়ত সারি সারি তালগাছ। আর সেই গাছে দোল খেত অদ্ভুত সুন্দর নিপুণ কারুকাজে তৈরি কিছু বাসা। বলা হচ্ছে 'শিল্পী পাখি' বা 'কারিগর পাখি' খ্যাত বাবুইয়ের কথা। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকায়নের ধাক্কায় আজ সেই পরিচিত দৃশ্যটি যেন অনেকটা রূপকথার মতো মনে হয়। হারিয়ে যেতে বসেছে প্রকৃতির এই বিস্ময়কর স্থপতি ও তাদের শৈল্পিক ঘর।
নিপুণ কারুকার্য: বুননশৈলীর এক বিস্ময়
বাবুই পাখির বাসা কেবল খড়কুটোর স্তূপ নয়, এটি এক অনন্য ইঞ্জিনিয়ারিং। খড়, তালপাতা আর কাশবনের লতাপাতা দিয়ে তারা এমনভাবে বাসা বোনে যা প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতেও ছিঁড়ে পড়ে না। বাসার ভেতরে থাকে একাধিক কক্ষ। এমনকি অন্ধকার দূর করার জন্য তারা বাসার দেওয়ালে ভেজা কাদা দিয়ে জোনাকি পোকা আটকে রাখে—যা এক প্রাকৃতিক বাতির কাজ করে। এই বিস্ময়কর বুদ্ধি ও ধৈর্যই বাবুইকে অন্যান্য পাখির চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
বাংলাদেশে মূলত তিন প্রজাতির বাবুই দেখা যায়, দেশি বাবুই, দাগি বাবুই ও বাংলা বাবুই। তবে বর্তমানে সবকটি প্রজাতিই অস্তিত্ব সংকটে। বাবুইরা সাধারণত তাল, নারিকেল বা খেজুর গাছে বাসা বাঁধতে পছন্দ করে। শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে বাঁচতে তারা পানির ওপর ঝুলে থাকা গাছের ডালে বাসা তৈরি করে, যাতে কেউ সহজে পৌঁছাতে না পারে।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই শিল্পীরা?
পরিবেশবিদদের মতে, আবাসস্থল সংকটই এর প্রধান কারণ। নির্বিচারে তালগাছ ও বড় গাছ কেটে ফেলায় বাবুইরা তাদের পছন্দের আশ্রয়ের জায়গা হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করায় এদের প্রধান খাদ্য শস্যদানা ও পোকামাকড় বিষাক্ত হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই পাখিদের জীবনচক্রে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
বাবুই পাখি কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এরা বাস্তুসংস্থানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের অকৃত্রিম বন্ধুর ভূমিকা পালন করে। প্রকৃতির এই বুননশিল্পীকে রক্ষা করতে হলে তালগাছ রোপণ এবং তাদের অভয়াশ্রম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।