ওজন কমাতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হওয়ার পেছনে কি মস্তিষ্ক দায়ী?

ওজন কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই কিছুদিন কঠোর ডায়েট ও ব্যায়াম করার পর হঠাৎ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে মনে হয়, এত কষ্ট করেও যখন ওজন কমছে না, তখন আর চেষ্টা করে কী লাভ! এরপর আবার আগের খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
অনেকে মনে করেন, ওজন কমাতে না পারার কারণ শুধু বেশি খাওয়া কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের অভাব। তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্ক, হরমোন, বিপাকীয় প্রক্রিয়া এবং পরিবেশ—সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘদিন খুব কম ক্যালরি গ্রহণ বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে শরীর ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়া ওজন কমানোর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
মস্তিষ্কের ‘ব্রেক’ ব্যবস্থা
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের হাবেনুলা নামের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে লেটারাল হাবেনুলা নেতিবাচক ফলাফল বা প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। এটি ডোপামিনসহ বিভিন্ন নিউরোকেমিক্যাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যা প্রেরণা ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেউ যদি কঠোর নিয়ম মেনে চলেন, নিয়মিত ওজন মাপেন এবং কাঙ্ক্ষিত ফল না পান, তখন হতাশা তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে মস্তিষ্কের পুরস্কার ও প্রেরণাসংক্রান্ত ব্যবস্থা পরিবর্তিত হলে ব্যায়াম বা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহও কমে যেতে পারে।
ব্যর্থতার পর তৈরি হয় মানসিক ফাঁদ
একবার কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে অনেকের মনে এমন ধারণা তৈরি হয়—‘আগেও তো চেষ্টা করে লাভ হয়নি, আবার কষ্ট করে কী হবে?’ এই মানসিকতা পরবর্তী প্রচেষ্টাকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ফলে কেউ কঠোর ডায়েট শুরু করেন, কিছুদিন পর তা ধরে রাখতে পারেন না, আবার আগের ওজনে ফিরে যান। এভাবে ওজন কমানো ও পুনরায় বেড়ে যাওয়ার একটি চক্র তৈরি হতে পারে, যাকে সাধারণভাবে ‘ইয়ো-ইয়ো ডায়েটিং’ বলা হয়।
ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে হরমোনের ভূমিকা
ওজন কমানোর সময় শরীর শুধু ক্যালরি কমিয়ে দেয় না, ক্ষুধা ও শক্তি ব্যবহারের সঙ্গেও সম্পর্কিত হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন আসে। গ্রেলিন ক্ষুধার অনুভূতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে, আর লেপটিন শরীরের শক্তির মজুত সম্পর্কে মস্তিষ্ককে সংকেত দেয়।
ওজন কমলে শরীরে লেপটিনের মাত্রা কমে যেতে পারে। তখন ক্ষুধা বাড়ার পাশাপাশি শরীরের শক্তি ব্যয়ের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কম ওজন বজায় রাখা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এর একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। খাদ্যের অভাবের সময় শরীরে জমা থাকা চর্বি ছিল শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থা শক্তি সঞ্চয় এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘদিন টিকে থাকার সুযোগ বাড়াত।
আগের ওজনের প্রভাব কতটা?
ওজন নিয়ন্ত্রণে মস্তিষ্কের ভূমিকা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় শরীরের আগের ওজন ও দীর্ঘমেয়াদি ওজন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কিছু গবেষণা বলছে, ওজন কমে যাওয়ার পরও শরীরের জৈবিক ব্যবস্থা আগের ওজনের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট একটি ওজনকে ‘স্থির’ করে রাখে এবং কোনোভাবেই তা পরিবর্তন করা যায় না। বরং ক্ষুধা, তৃপ্তি, শক্তি ব্যয়, শারীরিক কার্যকলাপ ও পরিবেশ—সবকিছুর পারস্পরিক প্রভাবেই ওজন নিয়ন্ত্রণ হয়।
কঠোর ডায়েটের বদলে টেকসই অভ্যাস
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে তাই দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অতিরিক্ত কড়াকড়ি করার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা সম্ভব—এমন অভ্যাস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।
শুধু ওজন মাপার যন্ত্রের সংখ্যাকে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড না বানিয়ে কোমরের মাপ, দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা, ঘুমের মান ও সামগ্রিক সুস্থতার দিকেও নজর দেওয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ঘুমের ঘাটতিও ক্ষুধা ও খাদ্য গ্রহণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ওজন কমানোর পরিকল্পনায় ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
ওজন নিয়ন্ত্রণে সমাজেরও ভূমিকা আছে
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতাকে শুধু ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তির সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। খাদ্যের সহজলভ্যতা, জাঙ্ক ফুডের প্রচার, নগর পরিকল্পনা, শারীরিক কার্যকলাপের সুযোগ এবং আর্থসামাজিক পরিবেশও মানুষের ওজন ও স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।
এ কারণে শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের সুযোগ বাড়ানো, জাঙ্ক ফুডের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ, হাঁটা ও সাইকেল চালানোর উপযোগী নগর পরিকল্পনা এবং খাবারের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
শৈশবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সময়। গর্ভাবস্থা থেকে শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক পরিবেশ ও জীবনযাত্রা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
লক্ষ্য হোক সুস্থ থাকা
ওজন কমানোর জন্য ক্র্যাশ ডায়েট বা অল্প সময়ে বড় পরিবর্তনের চেষ্টা অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়। বরং ধীরে ধীরে এমন জীবনযাপন তৈরি করা ভালো, যা দীর্ঘদিন অনুসরণ করা সম্ভব।
নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। কারণ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বিষয় নয়; এর পেছনে জিন, মস্তিষ্ক, হরমোন, বিপাকীয় প্রক্রিয়া ও পরিবেশ—সবকিছুর ভূমিকা থাকতে পারে।
নতুন গবেষণা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ওজন নিয়ন্ত্রণের আরও কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে। তাই ওজন কমানোর পথে বারবার বাধা এলেও হতাশ না হয়ে বাস্তবসম্মত ও টেকসই অভ্যাসের দিকে মনোযোগ দেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, দ্য কনভারসেশন, দ্য ডেইলি ডাইজেস্ট