সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj

যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কারণ দেখিয়ে বাড়ছে সয়াবিন তেলের দাম

যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কারণ দেখিয়ে বাড়ছে সয়াবিন তেলের দাম
ছবি : সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ দোকানেই বোতলজাত তেল তুলনামূলক কম পাওয়া যাচ্ছে, আবার অনেক মহল্লার দোকানে তা একেবারেই মিলছে না। একই সঙ্গে গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।

শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালীসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র জানা গেছে।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা বোতলজাত সয়াবিন তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এর মাধ্যমে বাজারে দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে তাদের ধারণা।

খুচরা ব্যবসায়ীদের মতে, কিছু কোম্পানি সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। ডিলার পর্যায়েই বোতলজাত তেলের দাম বেড়েছে, ফলে খোলা তেলের বাজারেও চাপ বেড়েছে। পাশাপাশি অনেক ক্রেতা সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। এতে বাজারে আরও চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এই পরিস্থিতি আরও দুই-তিন দিন চললে ভোক্তা পর্যায়ে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন প্রতিনিধি বলছেন, ডিজেল সংকটের কারণে তেলবাহী পরিবহন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় তার প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ছে।

২০২২ সালে ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা যায়। এরপর কয়েক বছর ধরে রমজান ও ঈদের আগে বাজারে ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার অভিযোগ উঠে আসছে। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতা, ডিলার, পাইকার ও আমদানিকারকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে।

গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে এসেছে। বিশেষ করে গত তিন-চার দিন ধরে সবচেয়ে বেশি চাহিদাসম্পন্ন পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারিত রয়েছে ৯৫৫ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও তারা ডিলারের কাছ থেকে এই বোতল ৯২০ টাকায় কিনতে পারতেন এবং ক্রেতাদের কাছে ৯৩০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি করতেন। বর্তমানে ডিলাররা সেই বোতল বিক্রি করছেন ৯৪০ থেকে ৯৫০ টাকায়। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল্য ৯৫৫ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে সংকট দীর্ঘ হলে নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন ছোট ব্যবসায়ীরা।

খুচরা ব্যবসায়ী ও ডিলারদের অভিযোগ

কারওয়ান বাজারের আব্দুর রব স্টোরের মালিক মো. নাঈম বলেন, পাঁচ কার্টন তেল চাইলে ডিলাররা মাত্র এক কার্টন দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ডিলাররা প্রতি লিটারে তিন থেকে চার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছেন।

মহাখালী কাঁচাবাজারের মাসুমা স্টোরের মালিক মো. আল-আমীন বলেন, কয়েক দিন ধরে কোম্পানিগুলো বোতলজাত তেলের সরবরাহ কম দিচ্ছে। অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্রেতা আতঙ্কে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন। এটিও সংকট তৈরির একটি কারণ।

ডিলারদের মতে, সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। কোম্পানি পর্যায়ে দাম না বাড়লেও ডিলার পর্যায়ে দাম বাড়ছে। কারওয়ান বাজারে তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এটিএন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. সেলিম বলেন, তীর ব্র্যান্ডের তেলের সরবরাহ বর্তমানে কম। শনিবার তিনি মাত্র ৫০ কার্টন তেল পেয়েছেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে দুই থেকে আড়াইশ কার্টন পাওয়া যায়। তিনি জানান, চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

আমদানিকারকদের বক্তব্য

টি কে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আথহার তাসলিম বলেন, পরিবহন সংকটের কারণে ভোজ্যতেল সরবরাহে কিছু সমস্যা হচ্ছে। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডিজেল পাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন স্থানে তেল পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, গরমের সময় পাম অয়েলের চাহিদা বেশি থাকে। বাংলাদেশ মূলত ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে পাম অয়েল আমদানি করে। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া পাম অয়েল রপ্তানিতে শুল্ক আরোপ করেছে এবং তারা ভোজ্যতেলের বদলে ডিজেল উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এছাড়া প্রায় এক মাস ধরে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম প্রায় ১০০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে মেঘনা গ্রুপের সহকারী সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার দাবি করেন, তাদের কারখানায় পর্যাপ্ত তেল মজুত রয়েছে এবং নিয়মিত বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, কিছু মানুষ গুজবে প্রভাবিত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনছেন, ফলে সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।

বোতল সংকটে বেড়েছে খোলা তেলের দাম

বোতলজাত তেলের সংকটের কারণে খোলা সয়াবিন তেলের বাজারেও চাপ বেড়েছে। ফলে দামও বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৭৬ থেকে ১৭৮ টাকা। অর্থাৎ লিটারে চার থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকার নির্ধারিত প্রতি লিটার পাম অয়েলের দাম ১৬৬ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ১৭০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, কয়েক দিন ধরে বোতলজাত তেলের সংকট চলছে এবং খোলা তেলের বাজারেও কিছুটা চাপ রয়েছে। এ কারণেই দাম কিছুটা বেড়েছে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রায়ই বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পরিবহনে সমস্যা হলেও তার প্রভাব ভোগ্যপণ্যের বাজারে পড়তে কিছুটা সময় লাগার কথা। কিন্তু তার আগেই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত মুনাফার এই প্রতিযোগিতা বন্ধ না হলে বাজারে ন্যায্য ব্যবসা পরিবেশ তৈরি হবে না। ঈদ সামনে রেখে বাজারে নজরদারি জোরদার করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, প্রতিদিনই বাজারে তদারকি করা হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির বিষয়টি তাদের জানা নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে রোববার কয়েকটি টিম মাঠে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন