রুশ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পুতিনের দল

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দল ইউনাইটেড রাশিয়া বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। প্রাথমিক ফলাফলে দলটির নিরঙ্কুশ আধিপত্যের চিত্রই ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিরোধীদের নির্বাচনী সুযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুক্রবার শুরু হয়ে রোববার শেষ হওয়া তিন দিনের নির্বাচনে রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন। সোমবার রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস জানায়, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৯০ দশমিক ৪৩ শতাংশ ব্যালট গণনা হয়েছে।
দলীয় তালিকার ভোটে এখন পর্যন্ত ইউনাইটেড রাশিয়া পেয়েছে ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ ভোট। স্টেট ডুমার ৪৫০টি আসনের মধ্যে ২২৫টি দলীয় তালিকার ভিত্তিতে এবং বাকি ২২৫টি একক আসনের নির্বাচনের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। একক আসনগুলোর বেশির ভাগও ইউনাইটেড রাশিয়ার দখলে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে প্রাথমিক ফলাফলে।
রোববার রাত পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৫৭ শতাংশের সামান্য কম। তাস জানিয়েছে, অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থায় ৩৬ লাখের বেশি মানুষ ভোট দিয়েছেন।
নির্বাচনের আগে থেকেই রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি বলে বিভিন্ন পক্ষ দাবি করেছে। উদারপন্থি ইয়াবলোকো পার্টির নেতারাও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
দলটির নেতা নিকোলাই রিবাকভ নিজের ব্যালট ইচ্ছাকৃতভাবে নষ্ট করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যালটে দলের নামের পাশে তিনি ‘শান্তির জন্য’ কথাটি লিখেছেন।
এবারের নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়ার পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য রাশিয়ান ফেডারেশন বা সিপিআরএফ। দলটি পেয়েছে ১৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব রাশিয়া বা এলডিপিআর পেয়েছে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ, নিউ পিপল ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং এ জাস্ট রাশিয়া পেয়েছে ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোট।
রাশিয়ার পার্লামেন্টে এসব দল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে ভোট দেওয়ার কারণে এগুলোকে দেশটির ‘সিস্টেমিক’ বিরোধী দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বার্লিনভিত্তিক থিংকট্যাংক নেস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব দলের পাওয়া ভোটের একটি অংশ পুতিন ও ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রতি নীরব অসন্তোষের প্রতিফলন হতে পারে।
নেস্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ক্রেমলিন সমালোচক মিখাইল খোদোরকভস্কির প্রতিষ্ঠানের ওই বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রভাব ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে রুশ সমাজে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও হতাশা নির্বাচনে প্রতিফলিত হতে পারে। তবে এটি বিশ্লেষণভিত্তিক মূল্যায়ন, নির্বাচনের ফলাফলের সরাসরি ব্যাখ্যা হিসেবে একে দেখা যায় না।
এর আগে ২০২১ সালের স্টেট ডুমা নির্বাচনে ৪৫০ আসনের মধ্যে ৩২৬টি পেয়েছিল ইউনাইটেড রাশিয়া। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিপিআরএফ পেয়েছিল ৫৭টি আসন।
এবারের ভোটে ইউক্রেনের দখল করা চার অঞ্চল—দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়াতেও ভোট নেওয়া হয়েছে। রাশিয়া ২০২২ সালে এসব অঞ্চল নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয়। ক্রিমিয়াতেও ভোট হয়েছে। তবে জাতিসংঘ ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এসব অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
ইউক্রেন রাশিয়ার নির্বাচনের সমালোচনা করেছে এবং দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে ভোট গ্রহণকে অবৈধ বলে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, রাশিয়া অভিযোগ করেছে, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার মাধ্যমে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
রোববার ইউক্রেনীয় ড্রোনের বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া যায়। রুশ আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মস্কো অঞ্চলে তিনজন এবং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত খেরসন অঞ্চলে দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন নির্বাচন কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া মস্কোর একটি তেল শোধনাগারের স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সোমবার সকালে রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে নতুন করে ড্রোন হামলার খবর আসে। ভারপ্রাপ্ত গভর্নর ইয়েগর কোভালচুকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন।
ফলে এবারের নির্বাচন শুধু স্টেট ডুমার আসন বণ্টনের বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিবেশ, ক্রেমলিনের প্রতি জনসমর্থন, বিরোধীদের নির্বাচনী সুযোগ এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব—সবকিছু নিয়েই নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরই ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রকৃত আসনসংখ্যা এবং অন্যান্য দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হবে।