শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম

নীলফামারীতে কৃষকদের মশাল মিছিল

নীলফামারীতে কৃষকদের মশাল মিছিল
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার সীমানায় অবস্থিত বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের জলাধার খননে বাধা, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় প্রায় ৭০০ কৃষক ও এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রতিবাদে মশাল মিছিল করেছেন স্থানীয়রা। শনিবার (৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বুড়ি তিস্তা এলাকায় সহস্রাধিক মানুষ এই মশাল মিছিলে অংশ নেন।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নীলফামারীর জলঢাকা থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) রাতে মামলা নম্বর ৪ এবং শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকালে মামলা নম্বর ৫ দায়ের করা হয়। দুটি মামলার বাদী হয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের জলঢাকা কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জুলফিকার আলী।

মামলাগুলোতে দণ্ডবিধির ১৪৩ ও ৪৪৮ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মামলায় ১৯ জন নামীয় ও অজ্ঞাত ৩০০ জন এবং অপর মামলায় ২২ জন নামীয় ও অজ্ঞাত ৩৫০ জনসহ মোট ৬৯১ জনকে আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জলঢাকা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নাজমুল আলম।

মামলার এজাহারে বলা হয়, বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের জলাধার খনন সরকারের একটি উন্নয়নমূলক কাজ। ওই কাজে বাধা দিয়ে অবৈধভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখলকারীরা বুড়ি তিস্তা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের সংরক্ষিত এলাকায় ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি—দুই দফায় হামলা চালায়। হামলায় সংরক্ষিত এলাকার আনসার ক্যাম্প এবং ঠিকাদারি কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। এটি কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল নয়; বরং পূর্বপরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে যাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, তারা শনিবার সন্ধ্যায় বুড়ি তিস্তা এলাকায় মামলার প্রতিবাদ ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মশাল মিছিল করেন। মশাল মিছিলে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীরা তাদের বক্তব্যে বলেন, তারা তাদের বাপ-দাদার আমলের তিন ফসলি জমি রক্ষার চেষ্টা করছেন।

তাদের দাবি, ডিমলা উপজেলার কুঠিরডাঙ্গা, রামডাঙ্গা, পচারহাট এবং পার্শ্ববর্তী জলঢাকা উপজেলার চিড়াভিজা, গোলনা ও খারিজা গোলনা—এই পাঁচটি মৌজায় প্রায় ৯৫৭ একর তিন ফসলি জমি রয়েছে। এছাড়া প্রায় ১৬০ একর জমিতে জনবসতি ও সরকারি স্থাপনা অবস্থিত। এসব জমিতে কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে ফসল উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

তারা জানান, ১৯৬৮ সালে তৎকালীন সরকার বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনায় পাঁচটি গ্রামের মোট ১ হাজার ২১৭ একর জমি হুকুম দখলে (মৌখিক সম্মতিতে) নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারিভাবে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। এরপর থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা মালিকানা সূত্রে জমিগুলো ভোগদখল করে আসছেন।

২০১০ সালে পাউবো কর্তৃপক্ষ এসব জমির মালিকানা দাবি করে ৪৯২ দশমিক ৭১ হেক্টর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি মেসার্স তুষুকা রিসোর্স লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সেখানে কার্যক্রম শুরু করলে এলাকাবাসী বাধা দেন। পরে জমির মালিকেরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। উচ্চ আদালতের আদেশে বর্তমানে কৃষকেরা ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন বলে দাবি করেন তারা।

কৃষকদের আরও অভিযোগ, সম্প্রতি পাউবো কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব তিন ফসলি জমিতে উঁচু বাঁধ দিয়ে জলাধার খননের চেষ্টা করছে। এতে প্রায় ৯৫৭ একর কৃষিজমি জলাধারের আওতায় পড়বে। বর্তমানে কৃষকেরা এসব জমিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। পাউবো ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন জমি ছাড়তে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করছেন। খননকাজের প্রতিবাদ করায় প্রায় ৭০০ কৃষকের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

এলাকাবাসীর হুঁশিয়ারি, এসব মামলা প্রত্যাহার না করা হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

এ বিষয়ে নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পাউবোর অধিগ্রহণ করা জমির সীমানা ও মালিকানা যাচাই শেষে অনুমোদন সাপেক্ষে জলাধার খননকাজ শুরু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব জমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নামে রেকর্ডভুক্ত এবং এর রাজস্ব প্রতি বছর সরকারকে পরিশোধ করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বুড়ি তিস্তা সেচ প্রকল্পের জলাধার খননসহ একাধিক উন্নয়ন কাজের নকশা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হলে প্রায় ৫ হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। তবে যেসব জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে দাবি করা হচ্ছে, সেগুলো পাউবোর অধিগ্রহণভুক্ত নয়—এ দাবি সঠিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ

আরও পড়ুন