বিগত ১৭ বছরের অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে যেন পুনরায় না ঘটে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) দ্বাদশ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা পাঁচ বছর পর সম্পন্ন হলো। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় স্টেডিয়ামে সমাবর্তন আয়োজন করা হয়। সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। দীর্ঘদিন পর চিরচেনা ক্যাম্পাসে ফিরে গ্র্যাজুয়েটরা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছিলেন। অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় বাবা-মাকে গাউন পরিয়ে দিচ্ছেন।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে যেমন প্যারিস রোড, বুদ্ধিজীবী চত্বর, পরিবহন চত্বর ও স্টেডিয়ামে ছবি তোলার জন্য শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন।
সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সকাল ৯টায় শিক্ষার্থীদের আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে। পরে সাড়ে ৯টায় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা তাদের আসনে বসেন। সকাল ১০:২৫ মিনিটে অনুষদ অধিকর্তারা সভাপতির নিকট ডিগ্রি উপস্থাপন করেন। সমাবর্তনের বিভিন্ন বক্তারা তাদের বক্তব্য দেন এবং দুপুর ১২টায় সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, “দেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এই সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং ন্যায্যতার পক্ষে সক্ষম মানবসম্পদ অপরিহার্য। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সেই লক্ষ্যেই গড়ে তুলছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানই দেয়নি, বরং চরিত্র গঠন, প্রশ্ন করার সাহস, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাস এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মানসিকতাও তৈরি করেছে। অনিশ্চয়তা ও কষ্টের মধ্যেও অধ্যবসায় ও হাল না ছাড়ার মানসিকতাই শিক্ষার্থীদের বড় অর্জন।
উপাচার্য বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে প্রযুক্তিগত বিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামাজিক রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন নীতিবান নেতৃত্ব, উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের সাহসী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও কর্মে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবর্তনের বক্তা ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ বলেন, “গ্র্যাজুয়েটরা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে সম্মানের চোখে দেখা হয়। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। তবে পরিবর্তন এখানেই শেষ নয়, প্রতিনিয়ত আমাদের নিজেকে নতুন করে রূপান্তর করতে হবে। ওয়ার্ল্ড ক্লাস সিটিজেন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষার্থীদের এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে হবে।”
সমাবর্তনের সভাপতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল ইসলাম আবরার বলেন, শিক্ষকদের ভূমিকা ভাবলে আমরা স্মরণ করি অধ্যাপক ড. সামসুজ্জোহা-এর আত্মবলিদানের কথা। তার ত্যাগ শিক্ষার প্রকৃত নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধের পরিচায়ক। জ্ঞান দায়িত্বের সৃষ্টি করে, আর সমাজের অন্যায়ের মুখোমুখি হলে নীরব থাকা সমর্থ নয়।
তিনি বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতি, রাজনীতি, বৈষম্যবিরোধী চেতনা ও দক্ষতার বিকাশে নেতৃত্ব দিয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কতটুকু সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছি? বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করা।”
শিক্ষা উপদেষ্টা শিক্ষার্থীদের সচেতন ভূমিকা পালন এবং দেশ ও সমাজের জন্য সক্রিয় ও ইতিবাচক অবদান রাখার আহ্বান জানান।
উল্লেখযোগ্য, এবারের সমাবর্তনে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জনকারী ১২টি অনুষদের মোট ৫,৯৬৯ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে ৭৯ জনকে পিএইচডি, ১১ জনকে এমফিল, এবং ৭৪০ জনকে এমবিবিএস ডিগ্রি প্রদান করা হয়।