কচ্ছপগতির ওয়াইফাইয়ে অতিষ্ঠ নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা

প্রযুক্তির এই যুগে পড়াশোনা, গবেষণা আর অনলাইন ক্লাসের জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় এ সুবিধা থাকা একেবারেই জরুরি। কিন্তু নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে।প্রায় পাঁচ বছর আগে পুরো ক্যাম্পাসে ওয়াইফাই চালু হলেও আজও সেটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।
২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসজুড়ে ওয়াইফাই চালু করে। তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দ্রুতগতির ইন্টারনেট পাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, গতি অত্যন্ত ধীর, সংযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং কাভারেজও সীমিত। ছোট ফাইল ডাউনলোড করতে অনেক সময় লাগে, কোনো ওয়েবসাইট খুলতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। এতে পড়াশোনা, অনলাইন লেকচার, গবেষণা কিংবা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা নানা বিড়ম্বনায় পড়ছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওয়াইফাই থাকলেও ব্যবহারযোগ্য নয়। সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যার ফলে অনলাইন ক্লাস বা গবেষণার কাজে সমস্যা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে এই সমস্যা আরও প্রকট। রাউটারের কাছাকাছি রুমে সামান্য গতি পাওয়া গেলেও ভেতরের রুমে ইন্টারনেট প্রায় থাকে না। অনেক শিক্ষার্থী জানাচ্ছেন, ল্যাব বা কম্পিউটার কক্ষে ইন্টারনেট থাকলেও ধীরগতির কারণে ব্যবহার করা যায় না।অন্যদিকে হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে মোবাইল ডাটা অথবা নিজস্ব খরচে ওয়াইফাই কিনে মাসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন।
নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের শিক্ষার্থী জুবাইয়া ঐশী বলেন,“পড়াশোনার জন্য ইন্টারনেট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু হলে সেই ইন্টারনেটে অনেক সমস্যা। নামমাত্র সেন্ট্রাল ওয়াইফাই দেওয়া হলেও এর গতি এত ধীর যে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব। প্রশাসন থেকে ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো ও উন্নত ওয়াইফাই দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। ফলে ল্যাপটপে মোবাইল ডাটা কিনে পড়াশোনা করতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সাফিন বলেন,“নোবিপ্রবির ওয়াইফাই শুধু নামেই আছে, কাজে আসে না। পড়াশোনার জন্য আমাদের নিজ খরচে মোবাইল ডাটা ব্যবহার করতে হয়।”
মালেক হলের শিক্ষার্থী সাজিদ ওয়ালিদ বলেন, “হলে প্রতিটি তলায় কার্যকরভাবে মাত্র একটি রাউটার আছে। এর মাধ্যমে পড়াশোনা বা ক্লাসের কাজ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি তলায় আরও রাউটার দিলে সমস্যা কিছুটা কমত।”
মালেক হলের শিক্ষার্থী আরাফাত অয়ন বলেন, “বিশ্ব এআইয়ের যুগে এগোচ্ছে। কিন্তু আমরা নোবিপ্রবিতে ইন্টারনেটের জন্য ভোগান্তি পোহাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা জরুরি।”
ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হলের সহকারী প্রোভোস্ট মো. ইউসা কাদির বলেন, “হলের গঠনগত জটিলতার কারণে রুমের ভেতরে ভালো স্পিড পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা বেশি রাউটার স্থাপন করলে নেটওয়ার্কে নয়েজ বেড়ে যাবে। আবার ২.৪ গিগাহার্জ থেকে ৫ গিগাহার্জে নেটওয়ার্ক বাড়ালেও ভালো ফল আসবে না। নেটওয়ার্ক সমস্যার সমাধানে প্রতিটি রুমে মাদার সকেট দেওয়া যেতে পারে, তবে বাজেট স্বল্পতার কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে না। আমরা আইসিটি সেলকে একাধিকবার এই বাজেটের জন্য চিঠি দিয়েছি, কিন্তু তেমন সাড়া পাইনি।”
মালেক হলের প্রোভোস্ট তসলিম মাহমুদ বলেন, “হলে বর্তমানে নয়টি রাউটার আছে, যা যথেষ্ট নয়। আরও ১০টি রাউটারের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এ অর্থবছরে নতুন ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী হলে ওয়াইফাই সংযোগ উন্নত করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি রুমে ল্যান কানেকশন দেওয়া যাবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক ড. মোহাম্মদ বেল্লাল হোসেইন বলেন, “বর্তমানে নোবিপ্রবিতে বিডিলাইনের মাধ্যমে ৫০০ এমবিপিএস ব্যান্ডউইথে ইন্টারনেট চলছে, কখনো কখনো এটি ৭৫০ এমবিপিএসও হয়। প্রতিটি ভবনে রাউটার আছে এবং ইউজারের ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তবে হলে ভবনের কাঠামোর কারণে রুমের ভেতরে স্পিড দুর্বল থাকে। এ সমস্যা সমাধানে প্রায় ২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি রুমে ল্যান কানেকশন দেওয়া হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, “আমরা বিডিলাইনের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টেন্ডার এখনো শেষ হয়নি। আশা করছি এই মাসের ২০ তারিখের মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তখন হলে ও বিভাগগুলোতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সরবরাহ করা সম্ভব হবে।”